নিজস্ব প্রতিনিধি, শালবনী: বর্ষার দুপুর। বাইরে মাঝে মধ্যেই ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। স্কুলের ঘণ্টা বেজে গিয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক অপেক্ষা করছেন। অথচ টুম্পা, ঝুম্পা, টনি কিংবা বাবলুরা তখনও মোবাইলের স্ক্রিনে ডুবে। কারও চোখ ফেসবুকের রিলসে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইন গেমে ব্যস্ত। ঠিক সেই সময় হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়লেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তাঁর গলা শুনে যেন চোখ কপালে পড়ুয়াদের। ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে লজ্জায় হেড স্যারের চোখের দিকে তাকাতে পারে না। অসহায় প্রধান শিক্ষক তাদের বোঝান, মোবাইলের নেশা তাদের কত বড় বিপদ ডেকে আনছে।
পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনী থানার কলাইমুড়ি নেতাজি সুভাষ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এখন বাড়ি বাড়ি দৌড়চ্ছেন, পড়ুয়াদের মোবাইলের নেশা কাটিয়ে স্কুলমুখো করতে। শিক্ষকরা জানাচ্ছেন, মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, বহু পড়ুয়াকে নিয়মিত স্কুলে আনা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের পাসওয়ার্ডও শুধু পড়ুয়ারাই জানে। ফলে অভিভাবকরা নিজেদের ফোন ব্যবহার করতেও সন্তানের অনুমতির অপেক্ষায় থাকেন। সকালেই পরিবারের সদস্যরা চাষের কাজে বেরিয়ে পড়লে অনেক পড়ুয়া স্কুলে না গিয়ে মোবাইল নিয়েই সময় কাটায়। বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণি থেকে এই প্রবণতা বেশি বলে দাবি শিক্ষকদের।
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিদ্যালয়ের বর্তমানে খাতায় কলমে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৩৭৫। কিন্তু প্রতিদিন উপস্থিত থাকে মাত্র ১২০ থেকে ১৩০ জন। এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ বাড়ছে স্কুল কর্তৃপক্ষের। প্রধান শিক্ষক সুভাষ জানা বলেন, এটা শুধু আমাদের স্কুলের সমস্যা নয়, প্রায় সব স্কুলেই একই ছবি। পাশফেল প্রথা তুলে দেওয়ার পর অনেক পড়ুয়ার মধ্যেই পড়াশোনার আগ্রহ কমেছে। অভিভাবকরা প্রয়োজনের কথা ভেবে স্মার্টফোন কিনে দিলেও তার নিয়ন্ত্রণ আর তাঁদের হাতে নেই। স্কুলে শিক্ষকের সংখ্যাও নামমাত্র। তাও আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবক ও পড়ুয়াদের বোঝানোর চেষ্টা করছি। এমন পরিস্থিতিতে অসহায় লাগছে। মোবাইল ফোনের জেরে বই পড়ার অভ্যাসটুকু চলে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সন্তোষ মণ্ডলের কথায়, অভিভাবকরা মাঠে কাজে চলে যাওয়ার পর অনেকেই আর স্কুলে যায় না। দল বেঁধে মোবাইলে গেম খেলে। ফোন কেড়ে নিতে গেলেই বাড়িতে অশান্তি শুরু হয়। রিচার্জ করার টাকা না দিলেও চলে তাণ্ডব। এক পড়ুয়াও স্বীকার করেছে, বন্ধুরা স্কুলে না গেলে তারও যেতে ইচ্ছে করে না। বরং সারাক্ষণ মাথায় ঘোরে মোবাইল আর অনলাইন গেমের চিন্তা। মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ওম প্রকাশ সিংহের মতে, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার শুধু সময় নষ্টই করছে না, পড়াশোনায় মনোযোগও কমিয়ে দিচ্ছে। কাল্পনিক জগতে বাস করছে পড়ুয়ারা। শিশু-কিশোরদের আচরণেও পরিবর্তন আনছে। তাঁর পরামর্শ, কাউন্সেলিং ও বিভিন্ন গ্রুপ অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে পড়ুয়াদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলছেন প্রধান শিক্ষক। নিজস্ব চিত্র