সংবাদদাতা, রামপুরহাট: একেবারে রকেটর গতিতে উত্থান হয় নলহাটির অভিশপ্ত পাথর খাদানের মালিক ভুলুর। প্রায় রাতারাতি শ্রমিক থেকে পাথর খাদান, ক্র্যাশার ও একাধিক গাড়ির মালিক হয়ে যায় সে। যদিও শেষরক্ষা হল না। শনিবার রাতে বানিওর গ্রামে উকিলের কাছে আইনি পরামর্শ নিতে আসার পথে ধরা পড়ে সে। রবিবার ধৃতের বিরুদ্ধে ভূমি সংস্কার আইন, খনি ও খনিজ আইন ও হত্যার উদ্দেশ্য সহ একাধিক ধারা যুক্ত করে রামপুরহাট আদালতে তোলা হয়। সরকারি আইনজীবী মণিরুল ইসলাম বলেন, বিচারক অভিযুক্তর জামিন নাকচ করে পাঁচদিন পুলিস হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আগে মাথায় করে পাথরের চিপস বোঝাই করে লরিতে লোড করত ভুলু। পাথর শিল্পাঞ্চল এলাকায় যাদের ‘লোডার’ বলা হয়। তখন রুজির টানে বাহাদুরপুর গ্রাম থেকে হেঁটেই যাতায়াত করে কাজ করত। কিন্তু দু’চোখে স্বপ্ন ছিল কোটিপতি হওয়ার। তাই শর্টকার্ট খোঁজা শুরু করে সে। সেই সময় আশোপাশে থাকা অনেকেই আদিবাসীদের জমি হরপ করে বা লিজ নিয়ে ক্র্যাশার, খাদান করে বড়লোক হয়ে উঠছে। অবশেষে সেই পথই অবলম্বন করে সে। বাহাদুরপুর লাগোয়া মদনা মৌজায় মাটির নীচের ‘পাথর’ লুটের পরিকল্পনা করে। মাথায় প্রভাবশালীর হাত থাকায় প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করেই অবৈধভাবে খননকার্য চালিয়ে পাথর উত্তোলন শুরু করে। তারপর, আর দেখে কে! অবৈধ উপায়ে জিলেটিনস্টিক, ডিটোনেটর জোগাড় করে খাদানে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টন পাথর বিক্রি করতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই বাড়তে থাকে তার সাম্রাজ্য। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিলাসবহুল বাড়ি ছাড়াও বর্তমানে একটি ক্র্যাশার ও একাধিক লরি, ডাম্পারের মালিক হয়ে উঠেছে ভুলু। তার দ্বিতল বিলাসবহুল বাড়ি পুরো সিসি ক্যামেরায় মোড়া। ভিতরে দামি দামি আসবাবপত্র। অনেকেই বলছেন, নাম ‘ভুলু’ হলেও সে অনেক ‘সেয়ানা’। প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ট বৃত্তে তার অবাধ বিচরণ ছিল। যাতে প্রশাসন তার টিকি ধরতে না পারে।
এভাবে লক্ষ্মীলাভ ভালোই হচ্ছিল। কিন্তু গত শুক্রবার সেই অবৈধ খাদানে ড্রিল করার সময় ধস নেমে মৃত্যু হয় ছয় শ্রমিকের। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন আরও চার শ্রমিক। ঘটনার পর থেকেই পরিবার নিয়ে ফেরার হয়ে যায় ভুলু। ওই রাতেই নলহাটি-১ বিএলএলআরও-র পক্ষ থেকে থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়। তাতে ভুলু ও তার ছেলে সুদীপ সহ অনেকে অবৈধভাবে খাদান চালাচ্ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। ভুলু গ্রেপ্তার হলেও সুদীপের খোঁজে জোর তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। এদিন মৃতদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান সিপিএমের পলিট ব্যুরোর সদস্য রামচন্দ্র ডোম। তিনি বলেন, সিন্ডিকেট গড়ে প্রাকৃতিক সম্পদ লুট চলছে। অবৈধ খাদানগুলি তো ভূতে চালাচ্ছে না। এই ভূতরা কারা? প্রশাসনের মদত ছাড়া কি চলতে পারে? ধৃত ব্যক্তি শ্রমিক থেকে মালিক হয়েছে। খুঁজলে এরকম অনেক মিলবে।
জেলার পুলিশ সুপার আমনদীপ বলেন, এর আগেও ওই এলাকায় অবৈধ খাদানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। তারপর লুকিয়ে খাদানটি চালাচ্ছিল। সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকার জন্যই ঘটনাটি ঘটেছে। ধৃতকে জেরা করে কার মদতে খাদান চালাচ্ছিল তা জানা হবে। এমন অবৈধ খাদান চিহ্নিত করার কাজ চলছে।