


হিমাংশু সিংহ: একদিকে দেশের সরকার, বিপরীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একা অগ্নিকন্যার বেনজির লড়াই, ব্যতিক্রমী নির্বাচন। ধর্ম-অধর্ম, হিতাহিত জ্ঞান, রাজনৈতিক সৌজন্য সব বিসর্জন দিয়ে চতুর্দিকে একটা অশান্তি আর ঘৃণার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা বিজেপির তরফে। আস্তিন গুটিয়ে নেমেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সিবিআই, ইডি সহ কেন্দ্রের সবকটি তদন্ত এজেন্সি পালা করে প্রার্থীদের বাড়িতে ঢুকে রোজ ভয় দেখাচ্ছে কিংবা ডেকে পাঠাচ্ছে। সঙ্গে আড়াই লাখ আধাসেনা, বশংবদ নির্বাচন কমিশন এবং প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ ডবল ইঞ্জিন রাজ্যের একাধিক মুখ্যমন্ত্রীর ডেলিপ্যাসেঞ্জারি। তাতেও স্বস্তি নেই বুঝে বঙ্গের মহামহিম রাজ্যপালকে পর্যন্ত খুলে আম নামিয়ে দেওয়া হয়েছে নির্বাচনি বাজারে। কার যেন ঘুঙুরের শব্দটাও শোনা যাচ্ছে দূর থেকে। গেরুয়া দলের হয়ে পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করছে রাজভবনও। এর নাম নির্বাচন না শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির দেশে বাঙালির গর্ব, কৃষ্টি ও অস্মিতাকে শেষ করার নির্ণায়ক যুদ্ধ? জবাব দেবে মানুষ।
আপনি পক্ষে থাকুন কিংবা বিপক্ষে মানতেই হবে, চতুর্দিক দিয়ে বাংলাকে গ্রাস করার এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন মমতা। বর্গী, মোগল, অত্যাচারী ইংরেজের পর স্বাধীনতা উত্তর বাংলায় আর কবে এভাবে এক মহিলা নেত্রীর উপর এমন ঘৃণ্য আক্রমণ নেমে এসেছে? যাঁরা স্বাধীনতারও আগে জন্মেছেন, সেই প্রবীণরাও মনে করতে পারছেন না এমন ভোটের কথা। কোনো অঙ্গরাজ্যের ভোটে দেশের সরকারি রাষ্ট্রযন্ত্রের এই পরিমাণ নির্লজ্জ অপব্যবহার দেখে আমরাও স্তম্ভিত। শুধু ভাবছি, যদি উলটোটা হত! আজও যদি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকতেন মোদিজি আর প্রধানমন্ত্রী হতেন মমতা, তাহলে খেলাটা কেমন হত? আমেদাবাদের অলিগলি রাজপথ পেরিয়ে লুডোর বোর্ড উলটে গদি দখলের ভোটে যদি এই একই খেলা চলত, তাহলে দাঙ্গাশ্রেষ্ঠ ঠিক কী করতেন, কী বলত গেরুয়া বিবেক নাগপুরের আরএসএস? মমতা কিন্তু প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়েও বাঙালির স্বার্থে যুদ্ধের সামনের সারিতে। এতটুকু টোল পড়েনি তাঁর প্রতিবাদী মেজাজে। একই দিনে কোচবিহার থেকে দমদম, দৌড়ে বেড়ানো অক্লান্ত স্ট্রিট ফাইটার। আপস তাঁর রক্তে নেই। আগামী এক পক্ষকালের মধ্যে যে বাঙালি সমাজ রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিরুপণে মূল্যবান মতদান করবে, তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—বাংলার অগ্নিকন্যার উপর যাঁরা এই আঘাত নামিয়ে আনতে পারেন তাঁদের হাতে নারী সমাজ কি আদৌ সুরক্ষিত থাকতে পারে? ভরসা করতে পারে যুবসমাজ? সংসদে মহিলা সংরক্ষণের আড়ালে ডিলিমিটেশনের কুনাট্য পরাজিত হয়েছে শোচনীয়ভাবে। কারণ, বিজেপি লিখে দিলেও তাতে বিশ্বাস নেই। ভোটপর্বে ৩ হাজার টাকার গাজর ঝোলানো বিরাট জুমলা, স্রেফ ভোটের চাল। ভরসা করা যায় না। বিজেপি এসব করলে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থাকে কমিশন। দেখেও দেখে না! আইন লঙ্ঘন তো শুধু বিরোধীদের বেলায়!
কে না জানে কংগ্রেস অনেক আগেই চুরমার হয়ে গিয়েছে নিজের ভুলে। কিন্তু সেই একুশ সাল থেকে হাতের সব তাস খেলেও মমতার সঙ্গে পেরে উঠতে ব্যর্থ মোদিজি ও তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ড গুজরাতি ভাই অমিত শাহ। অথচ বাংলার দু’বিঘা না পেলে বিশ্বগুরু মুখ দেখাবেন কী করে? সেই রাগে আর হতাশায় প্রতিশোধ নিচ্ছেন বারবার। তা করতে গিয়ে বাংলার সাধারণ ভোটারদের উপর নেমে আসছে খাঁড়া! আগেরবার দল ভেঙে, আর গুটিকয়েক গ্রেপ্তারে বাজিমাতের সহজ ফরমুলায় কাজ হয়নি। এবার ভোটার লিস্টটাকেই আগাপাছতলা বদলে বাঙালির মেকি বন্ধু সাজার প্রাণান্তকর চেষ্টা। তবুও বঙ্গ দখল যে এবারও দূরঅস্ত তা অমিত শাহরা বিলক্ষণ জানেন। আর তা জানেন বলেই লজ্জার মাথা খেয়ে অনুগত রাজ্যপালকে কাছা খুলে ময়দানে নামাতেও পিছপা নন। কোনো ডবল ইঞ্জিন রাজ্যের লাটসাহেব এমনটা করলে ৩ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরতে হত। কিন্তু রবিবাবু তামিলনাড়ুর পর পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া এজেন্ডায় শান দিয়েছেন, তাঁর প্রোমোশন তো বাঁধা।
তবে জগদীপ ধনকার থেকে সিভি আনন্দ বোস রাজভবনকে বিজেপির কর্পোরেট কার্যালয়ে পরিণত করেও শেষপর্যন্ত টিকে থাকতে পারেননি। তাঁদের ভয় ভরসা দুই মিলিয়ে গিয়েছে। বিজেপি যে কত ভয়ংকর দল তা দু’জনেই টের পেয়েছেন আকস্মিক পর্বতের চূড়া থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলার বেনজির সরকারি ফরমানে। দু’জনেই হারিয়ে গিয়েছেন আতঙ্কে। সবিনয়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করি, উত্তরপ্রদেশ কিংবা মহারাষ্ট্রের কর্তব্যরত রাজ্যপালরা যদি তামিলনাড়ু-ফেরত আর এন রবির মতো রাজভবনে বসে সরকার পরিবর্তনের রাজনৈতিক স্লোগান তোলেন, এভাবে নীরবে তা সহ্য করবেন তো! রাজ্যসভার চেয়ারম্যান জগদীপ ধনকার মাথা নীচু করে কথা শোনেননি বলে তাঁকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিসে দেশের উপরাষ্ট্রপতির মতো মর্যাদার সাংবিধানিক পদ থেকে হটাতে কসুর করেনি গেরুয়া শক্তি। এই শাস্তি অন্যদের ভয় দেখিয়ে আনুগত্য আদায়ের। মোদি জমানায় সাংবিধানিক পদ ও প্রতিষ্ঠানের শোচনীয় চেহারাটা বাংলা বছরের প্রথম দিনে রাজ্যপাল রবির বচনেই স্পষ্ট। রাজ্যপালরাও যদি কলকারখানার অসহায় শ্রমিকের মতো চাকরি বাঁচাতে রাজভবনে বসে রাজনীতি করতে শুরু করেন তাহলে সংবিধান, গণতন্ত্র কোনপথে সুরক্ষিত থাকতে পারে? ভাবুন তো, যদি একই ডাক রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ভেসে আসে! দেশের এক নম্বর নাগরিক যদি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে কেন্দ্রে বদল চান! যুব সমাজে এত বেকারি কেন, নোট বাতিলের পরও কালো টাকা হাতে হাতে ঘুরছে কেন, সরকারি চাকরি হচ্ছে না কেন, প্রশ্ন তোলেন। পরিবর্তনের স্বপ্ন ফেরি করতে বসেন, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের ভিতরে তার কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে? সেই ভূমিকম্প নরেন্দ্র মোদির সহ্য হবে তো! কাকে ভয় দেখাবেন আর কাকে ভরসা দেবেন তখন?
বাংলায় প্রথম দফার ভোট-প্রচার শেষ হতে ঠিক দু’দিন বাকি। এখনও রাজ্যের ভোটার তালিকা আকাশেই ভাসছে? এটা কোন ভরসা জাগাতে পারে বঙ্গবাসীর মনে! আর কোন রাজ্যে এমন নজির আছে? অতীতে কোনোদিন এমন হয়েছে? লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি কথাটা যে শুধু বাংলার ইভিএমকে কবজা করার জন্যই আমদানি করা হয়েছে তা তো সর্বোচ্চ আদালতও ইনিয়ে বিনিয়ে স্বীকার করেছে। বিচারাধীন ৬০ লাখের মধ্যে শেষপর্যন্ত বুথে যাওয়ার অনুমতি কারা পেলেন আর কারা পেলেন না, তা জানা যাবে যথাক্রমে ২১ ও ২৭ এপ্রিল। সুপ্রিম কোর্টের এমনই নির্দেশে। মানতেই হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সক্রিয়তাতেই আদালতের এই হস্তক্ষেপ। বলুন তো, কাদের বেহায়াপনায় এমন পরিণতি? স্বাধীনতার পর আর কোনো রাজ্যে এমন অনিশ্চয়তার বাতাবরণে ভোট হয়েছে? প্রচার শেষের দিন পর্যন্ত ট্রাইবুনাল যাঁদের ছাড়পত্র দেবে, তাঁদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। এই কৃতিত্বটা অগ্নিকন্যাকে দেবেন না? সেই চূড়ান্ত তালিকায় হিন্দু নয়, রোহিঙ্গারাও নয়, স্থান পাবে নিপীড়িত বঙ্গবাসীই! এই অধিকার পুনরুদ্ধারের কৃতিত্বটা কার? যিনি অধিকার ফেরাতে পারেন তিনিই তো ভরসা দেওয়ার আদর্শ নেত্রী! বিপরীতে আছে সেই শক্তি, যারা বশংবদ নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে বিগত ৬ মাস ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদের চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলা বিরোধী সেই ষড়যন্ত্রীদের মুখের উপর জবাব দেবেন না? গর্জে উঠবেন না ভোটযন্ত্রের বোতামটা টিপতে গিয়ে? যিনি সুপ্রিম কোর্টে হাজির হয়ে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছেন, সেই অকুতোভয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেউ ফেরাতে পারে? তিনি অর্ধশতাব্দী এই বঙ্গে মানুষের লড়াইয়ের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা। যখনই বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উদ্ধত বন্দুকের খোঁচা খেয়ে আপনি ইভিএমের বোতাম টিপতে উদ্যত হবেন তখন লড়াকু নেত্রীর মুখটা মনে পড়বে না? মাছেভাতে ফুটবলে আর টপ্পা-বাউলের রাঙামাটির অনাবিল সুরে নিঃশ্বাস নেওয়া বাঙালি বিজেপির সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সহ্য করতে রাজি নয়। আরও এক দশক চেষ্টা করেও গেরুয়া শক্তি বাঙালির ডিএনএ বদলাতে পারবে না। মেরুদণ্ড সোজা করে সুন্দরবন থেকে কোচবিহার বলবে মেকি ভরসা চাই না, আমরা থাকব আমাদের মতো।
আবারও প্রশ্ন করি, এমন ভোট আগে কখনো কোনো স্বাধীন দেশের অঙ্গরাজ্যের মানুষ দেখেছে? আগামী দিনেও আর দেখবে না। আজ থেকে অর্ধশতাব্দী পর এই ভোট গবেষণার বিষয় হবে পাঠ্য বইতে। সিবিআই নেমেছে। সদর্পে ইডি ঘুরছে। নির্বাচন কমিশন বিষদাঁত, নখ বার করে যেন তেন প্রকারে আঁচড়াতে মরিয়া। কাশ্মীর থেকে আধাসেনার বিশেষ মার্কসম্যান সাঁজোয়া গাড়ি এসেছে। একটা নয়, চার চারটে। নিশ্চিতভাবেই যেন ‘অপারেশন বেঙ্গল’। মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, ডিজি, ডজন ডজন পুলিশ কর্তা বদল করেই ক্ষান্ত হয়নি কমিশন, খোলাছুট দিয়েছে কেন্দ্রের শাসকদের! ভাবা যায়, স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে মহিলাদের মাসিক ৩ হাজার টাকা দেওয়ার ফর্ম বিলি করছেন দেশের অর্থমন্ত্রী! এটা নির্বাচনি বিধি লঙ্ঘন নয়? দিল্লিতে আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার খোয়াব দেখিয়ে আজও প্রাপ্তি শূন্য। বছরে দু’কোটি চাকরি আকাশে ভাসছে। আর দিল্লির সেই মুখ্যমন্ত্রীই বাংলায় এসে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে লম্বা চওড়া ভাষণ দিচ্ছেন। মহারাষ্ট্র, বিহার থেকে দিল্লি সর্বত্র এটা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে বিজেপি যতই দাপট দেখাক আসলে মহিলা ভোট জিততে মমতার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে নকল করা ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো পথ নেই। লোক নেই বলে যেমন দলবদলুরাই আজ বিজেপির প্রাণ। অসম, মণিপুর, অরুণাচল, বিহারে আজ যাঁরা ‘ডবল ইঞ্জিন’ মুখ্যমন্ত্রী তাঁরা কেউ সংঘ পরিবারের নয়। হিমন্ত বিশ্বশর্মা, পেমা খাণ্ডু, সম্রাট চৌধুরীরা স্বার্থের সংঘাতে, মামলা থেকে বাঁচতে বিজেপিতে। এককথায় আজ যাঁরা বিজেপির ভরসা তাঁরা গেরুয়া দলে নাম লিখিয়েছেন স্রেফ মামলার ভয়ে। পিঠ বাঁচাতে। মণিপুর গত তিন বছর জ্বলছে। মানুষ মরছে। মোদিজি একবারও ভরসা দিতে পায়ের ধুলো দিয়েছেন? ভোট চুকলে ঝড়-ঝঞ্ঝা তুফান যাই আসুক আর গুজরাতি ভাইদের দেখা মিলবে না বঙ্গেও। আগামী লোকসভা ভোট পর্যন্ত ভরসাবাবুদের ছুটি। বাঙালি এই রসায়নটা জানে বলেই অমিত শাদের কপালের ভাঁজ এবারও চওড়া। ৪ মে মমতাতেই আস্থা রাখবে বাংলা। একা লড়ে আবার ইতিহাস গড়ার পথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভরসা রাখুন!