নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: স্পেন থেকে এল গাছ। বসানো হল হুগলির পাণ্ডুয়ার বৈঁচিগ্রামের বাগানে। পরিবেশ রক্ষার একটি নাগরিক উদ্যোগে লেগে গেল আন্তর্জাতিক ছোঁয়াচ। সদ্য সেই গাছ বসেছে। এখনও শিকড় হয়ত নড়বড়ে। কিন্তু সেই বাগানের একটি নিজস্ব শিকড় আছে। আছে স্মৃতিরক্ষার একটি প্রেক্ষাপট ও একদল মানুষের গ্রামের প্রতি ভালোবাসার নিবিড় কাহিনি। একদা গাছ বাঁচানোর পরিকল্পনা নিয়ে রচনা না লিখে গাছ বসাতে নেমেছিলেন বৈঁচিগ্রামের একদল যুবক। সময় গড়িয়েছে নিজের গতিতে। এখন ডিভিসি ক্যানালের ধারে এক ফালি জমিতে নধর হয়ে উঠেছে প্রায় ৫০টি গাছ। সবই ফলের। শুধু স্পেনের গাছটি ফুলের।
আবার, বৈঁচিগ্রামের বাগানকে ঘিরেছে তাল গাছের সারি। সেখানেও আছে বজ্রপাত প্রতিরোধের নিরুচ্চার বার্তা। দূর থেকেই সেই সবুজ চোখে পড়ে। স্মৃতিমেদুর হয় উদ্যোক্তাদের চোখ। তাঁদের একটি সংস্থা আছে, যার পোশাকি নাম আটচালা। তাঁরা জড়িয়ে আছেন কেন্দ্রীয় সরকারের যুবকল্যাণ মন্ত্রকের ‘মাই ভারত’ প্রকল্পের সঙ্গে। কিন্তু গাছ বসিয়ে বাগান গড়ার কাহিনি ভিন্ন। পরিবেশ রক্ষাই শুধু নয়, জড়িয়ে আছে আরও নানা ভাব ও ভাবনা। কী সেসব? আটচালার সম্পাদক প্রীতম মুখোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ছাত্র। তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণ তো ছিলই, সঙ্গে ছিল প্রিয় মানুষের স্মৃতি তর্পণ। ঠিক করেছিলাম বাবা, মা’য়ের মতো প্রয়াত অভিভাবকদের স্মৃতি গাছ দিয়ে সংরক্ষণ করব আমরা। সেই ডাকেই সাড়া দিয়েছেন বহু মানুষ। তবে ভিন দেশ থেকে গাছ আসা এই প্রথম। গ্রামের এক যুবক কর্মসূত্রে জার্মানিতে থাকেন। তিনি সম্প্রতি স্পেনে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি গুলমোহর জাতীয় গাছের চারা তাঁর পছন্দ হয়। সেটি তিনি তাঁর অভিভাবককে উৎসর্গ করে আমাদের বাগানে রোপণের জন্য পাঠিয়েছেন। তাঁর ওই পদক্ষেপ আমাদের উদ্যোগের পরিধি যেমন বাড়িয়েছে, তেমনই বাড়তি দায়বদ্ধতাও তৈরি করেছে। হুগলির পরিবেশপ্রেমী গৌতম সরকার বলেন, একদা নাগরিক উদ্যোগে নগরায়ন হয়েছে, এখন নাগরিকরাই এগিয়ে আসছেন অরণ্য গড়তে। এখানে বিদেশ থেকেও মানুষ অংশ নিচ্ছেন। সন্দেহ নেই, পরিবেশ রক্ষার তাগিদ উচ্চগ্রামে উঠেছে।
বৈঁচির ডিভিসি ক্যানালের ধারে ওই অপরিসর বাগান শুধু পরিবেশ আর স্মৃতিরক্ষা নয়, আরও বেনজির বার্তা দিচ্ছে। উদ্যোক্তরা জানিয়েছেন, বাগানে অধিকাংশ গাছই আম, আমলকি আর জামরুলের। আগামীতে ফল হলে তার অর্ধেক রেখে দেওয়া হবে গাছেই। কেন? কারণ, পাখিদের খাবার কম পড়ছে। নিজেদের মর্জি মতো, স্বাভাবিক পরিবেশে ফল খাবে পাখিরা। আর কিছু ফল বিক্রি করে তা শিশুশিক্ষার কাজে ব্যবহার করা হবে। তবে সেসব এখন দূর। আপাতত স্বদেশি আমের পাশে সবেগে মাথা দোলাচ্ছে স্পেনের গুলমোহর। বৈঁচি থেকে বিশ্বজনীন হওয়ার পথে হাঁটছে এক নিরীহ বাগান।