দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: তাহেরপুরের বি-২৪ রাস্তার পাশে রংচটা একটা ফ্যাকাশে বাড়ি। খানিক মাথা নামিয়ে ঢুকতে হয় ভিতরে। ঢুকলে নজর কাড়ে একটি ছবি। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে ক্র্যাচ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সোমনাথ মালো। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে প্যারা এশিয়ান গেমসে হাইজ্যাম্পে ভারতের হয়ে সোনা জিতেছিলেন তিনি। ২০১৬ সালে শিক্ষাকর্মী হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম রায়ে ওই প্যানেলটি পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে চাকরি খুইয়েছেন সোমনাথাও। তিনি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন হাওয়ার পাশাপাশি ব্লাড ক্যান্সারেও আক্রান্ত। এখানেই সোমনাথের প্রশ্ন, নলহাটির ক্যান্সার আক্রান্ত সোমা দাসের চাকরি যদি মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বহাল থাকে, তা হলে আমি কি দোষ করলাম?’ উত্তরের আশায় প্রহর গুনছেন বাংলার প্রাক্তন এই অ্যাথলিট। বাগ মানছে না তাঁর চোখের জলও!
২০০২ সাল বুসানে আয়োজিত এশিয়ান গেমস ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন সোমনাথ। সেই কৃতিত্ব কেউ মনে রাখেনি। বাড়িতে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ছবিগুলি তাঁর কৃতিত্বের প্রতীক মাত্র। সোনার পদক স্রেফ একটা স্মৃতি হয়ে থেকে গিয়েছে। স্পোর্টস কোটায় কোনও চাকরি মেলেনি তাঁর। তৎকালীন রাজ্যের বাম সরকার একটা পুষ্পস্তবক দিয়েও সৌজন্য দেখায়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে অবশ্য সংবর্ধনা পেয়েছিলেন। ২০১৪ সালে স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বসেন সোমনাথ। ২০১৬ সালে এসে চাকরি পেয়েছিলেন। করণিক হিসেবে নিয়োগ হয়েছিল বাড়ির কাছেই বীরনগর হাইস্কুলে। পোলিওর কারণে প্রতিবন্ধকতার জীবনে অক্সিজেন জুগিয়েছিল চাকরিটা। ধীরে ধীরে অভাবের সংসারকে দাঁড় করাচ্ছিলেন। ভাগ্যের চাকাটা বদলাতে না বদলাতেই ব্ল্যাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। তার পর চাকরি জীবনে এমন ধাক্কা! প্রায় সাত বছর চাকরি করার পর এভাবে বিপর্যয় নেমে আসবে, তা ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেননি সোমনাথ। বর্তমানে প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকার ওষুধ লাগে সোমনাথের। মাস মাইনেতে সংসার চালিয়ে কোনওরকম ওষুধ কিনতেন। এবার কী করবেন ভেবে কুল-কিনারা ভেবে পাচ্ছেন না।
শুক্রবার সোনার পদকের দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, ‘বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী এবং এক মেয়েকে নিয়ে আমার সংসার। এই বয়সে এসে মাত্র তিন মাস পড়াশোনা করে আর কি চাকরি পাওয়া সম্ভব? সোমার মতো আমিও তো ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। সরকার কেন আমার চাকরি ফেরত দেবে না? মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আবেদন করব। সরকারের পক্ষ থেকে যাতে আদালতে আবেদন করে আমার চাকরিটা বহাল রাখার ব্যবস্থা করে। মুখ্যমন্ত্রী উপর আমার আস্থা রয়েছে। চিকিৎসা করাতে না পারলে আমি মারাই যাব। আমার সংসার ভেসে যাবে।’
একসময় কলকাতা হাইকোর্টে সমস্ত গ্রুপ সি কর্মীদের সঙ্গে সোমনাথের মামলাও শোনা হচ্ছিল। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে অর্থের অভাবে আইনজীবী নিয়ে আর পৌঁছাতে পারেননি তিনি। যদি পারতেন, তা হলে হয়তো চাকরিটা থেকে যেত আক্ষেপ করছিলেন স্বর্ণপদক জয়ী। নিজস্ব চিত্র