নিজস্ব প্রতিনিধি, বাঁকুড়া: একসময় বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের বাসিন্দারা গুলির শব্দ শুনে ঘুমাতে যেতেন। তাঁদের ঘুম ভাঙত পুলিসের ভারী বুটের আওয়াজে। জঙ্গলমহলের সেই ইতিহাস এখন অতীত। শান্তি ফেরার পর থেকে জঙ্গলমহলের ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন পরীক্ষায় ভালো ফল করছে। এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় খাতড়া মহকুমার পাঁচ পড়ুয়া নজির গড়েছে। এছাড়া পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত গ্রামের ছাত্র সৌরিন রায়ও মেধা তালিকায় সপ্তম স্থান দখল করেছে। জঙ্গলমহলের পড়ুয়াদের এই ফলাফলে খুশির হাওয়া বইছে।
ইন্দপুরের নূতনডিহি গ্রামের মেয়ে দেবাদ্রিতা চক্রবর্তী সপ্তম স্থান দখল করেছে। সে বাঁকুড়া মিশন গার্লস হাইস্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়েছিল। সে পড়াশোনার জন্য বাবা-মায়ের সঙ্গে বাঁকুড়া শহরে ভাড়া বাড়িতে থাকত। খাতড়ার কংসাবতী শিশু বিদ্যালয়ের সৌপ্তিক মুখোপাধ্যায় ৬৮৮ নম্বর পেয়ে অষ্টম স্থান দখল করেছে। তার সঙ্গে অষ্টম স্থানে থাকা অন্য কৃতী শুভ্র সিনহা মহাপাত্র বর্তমানে কেন্দুয়াডিহিতে ভাড়া থাকলেও আদি বাড়ি খাতড়াতেই। শুভ্র বাঁকুড়ার পুয়াবাগানের বিবেকানন্দ শিক্ষানিকেতন হাই স্কুল থেকে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছিল। ওই স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে মেধাতালিকায় দশম স্থান দখল করা প্রিয়ম পাল ও তুহিন হালদারের বাড়িও জঙ্গলমহলে। প্রিয়মের বাড়ি সিমলাপাল থানার পুখুরিয়া গ্রামে। তুহিন সারেঙ্গার বাসিন্দা। ওই কৃতীরা চিকিৎসক ও ইঞ্জিনিয়ার হয়ে পিছিয়ে পড়ার তকমা পাওয়া জঙ্গলমহলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প করেছে।
তুহিন বলে, যাতায়াতের সমস্যার কথা ভেবে আমি পুয়াবাগানে স্কুলের হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করি। কোনও প্রাইভেট টিউশন না নিয়েও আমি সফল হয়েছি। প্রিয়মের বক্তব্য, আমি দৈনিক স্কুল বাসে যাতায়াত করতাম। দীর্ঘ পথ যাতায়াতের ধকল সহ্য করেও পড়াশোনার সঙ্গে আপোস করিনি। সৌপ্তিক বলে, আমি প্রাথমিকস্তর থেকেই খাতড়ায় পড়াশুনা করছি। খাতড়ার মতো জায়গায় থেকেও যে মাধ্যমিকের মতো মেধাতালিকায় ঠাঁই পাওয়া যায়, তার প্রমাণ করতে পেরে ভালো লাগছে। শুভ্র বলে, আগামী দিনেও জঙ্গলমহলের ছাত্রছাত্রীরা মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের মতো বড় পরীক্ষায় কৃতিত্ব দেখাবে বলে আশা করছি।
রাজ্যের মেধা তালিকায় সপ্তমস্থান দখল করেছে আউশগ্রামের জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত গ্রামের ছাত্র সৌরিন রায়। তার প্রাপ্ত নম্বর ৬৮৯। আউশগ্রাম-২ ব্লকের অমড়াগড় উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সৌরিন ছোট থেকেই মেধাবী। বাবা অভিজিৎ রায় স্কুল শিক্ষক। আর মা বর্ণমালা রায় গৃহবধূ। সৌরিন জানায়, সারাদিনে প্রায় ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় পড়াশোনা করত সে। পাশাপাশি নজরুলগীতিও চর্চা করে। এদিন সে বলে, খুব ভালো লাগছে। বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখি। এই সাফল্যের জন্য প্রাইভেট শিক্ষক ও স্কুলের শিক্ষকদের অবদান অনেক। ছেলের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তার বাবা ও মা। তাঁরা বলেন, ছেলেকে পড়াশোনার জন্য কোনওদিন বলতে হয়নি। আমরা গ্রামে থেকেও যে মেধাতালিকায় স্থান পাব তা ভাবিনি। তবে স্বপ্ন দেখতাম ছেলে একদিন রাজ্যে সুনাম অর্জন করবে।