


নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: মৃত মায়ের চোখ ‘বিক্রি’ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠল তিন পুত্র সহ পরিবারের ছ’জন সদস্যের বিরুদ্ধে। রবিবার এমন ঘটনায় তোলপাড় কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানার সেনপুর শ্যামনগর এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিবারের ছ’জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে কোতোয়ালি থানার পুলিশ। ধৃতদের নাম আমির চাঁদ, সাবদুল শেখ, আবদুল শেখ, অঞ্জু বিবি, মঞ্জু বিবি, মহাসিনা বিবি। সোমবার ধৃতদের কৃষ্ণনগর আদালতে তোলা হয়। বিচারক তিন দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। যদিও কর্ণিয়া সংগ্রহকারী সংস্থার সম্পাদক তপন মজুমদার বলেন, ‘কালিরহাটের এক ভদ্রলোক তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর চক্ষুদান করেছেন। ২০২৪ সালে ওঁর মা চক্ষুদানের অঙ্গীকার করে গিয়েছিলেন। মায়ের মৃত্যুর পর কর্ণিয়া সংগ্রহের জন্য আমাদের খবর দেন। নিয়মানুযায়ী সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিবারের লোককে তার রিসিভ কপিও দেওয়া হয়েছে। আমরা সংগৃহীত দু’টি কর্ণিয়া মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজের আই ব্যাঙ্কে পাঠিয়ে দিই। সেটাও রিসিভ করানো হয়েছে। তার প্রতিলিপি আমাদের কাছে এসেছে। জোর করে কর্ণিয়া নেওয়া হয়নি। মৃতার পরিবারের লোকজনের সম্মতিতে নেওয়া হয়েছে।’ ধৃত আমির চাঁদ মৃতার ছেলে। এলাকায় পরিবেশকর্মী হিসেবেও পরিচিত। আদালতে যাওয়ার সময় তিনিও বলেন, ‘আমার মা মারা গিয়েছেন। কর্ণিয়া দান করে গিয়েছিলেন। এ জন্য গ্রেপ্তার করা হল। আসলে, আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার বেলার দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যু হয় শ্যামনগরেরর বাসিন্দা রাবেয়া বিবির। মৃত্যুর পরপরই একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কয়েকজন সদস্য চিকিৎসক সহ মৃতার বাড়িতে উপস্থিত হন। অভিযোগ, পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই মৃতার কর্ণিয়া সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাটি জানাজানি হতেই এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রবিবার রাতের দিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ মৃতার বাড়িতে ঢুকে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, মৃতার কর্ণিয়া দানের নামে বেআইনিভাবে বিক্রি করা হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় কোতোয়ালি থানার পুলিশ। উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রবিবার রাতেই পুলিশ পরিবারের ছ’জন সদস্যকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে রাবেয়া বিবি মৃত্যুর আগেই কর্ণিয়া দানের সম্মতি দিয়ে গিয়েছিলেন। তবে সেই দাবির স্বপক্ষে কোনও বৈধ নথি, লিখিত সম্মতি বা চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমাণ পুলিশকে দেখাতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। এর জেরেই এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে কর্ণিয়া চুরির অভিযোগ দায়ের করা হয়। তদন্তে নেমে মৃতার তিন ছেলে ও তিন মেয়েকে গ্রেপ্তার করে কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানার পুলিশ। সোমবার ধৃতদের কৃষ্ণনগর জেলা আদালতে তোলা হলে বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়। গোটা ঘটনার সঙ্গে কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা চিকিৎসক জড়িত ছিলেন কি না, কর্ণিয়া সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইন মেনে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না—তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরমান আলি মণ্ডল বলেন, ‘রবিবার আমাদের পাড়ায় একজন মহিলা মারা গিয়েছেন। আমরা সকলেই দেখতে গিয়েছিলাম। তখন চার-পাঁচজনের ডাক্তারের একটি দল ঢুকেছিল। বাড়ির লোকজন সবাইকে বাইরে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। মৃতার চোখ তুলে নিয়েছিল। তখন আমরা বিষয়টি থানাকে জানাই। মৃতার চোখ চুরি করা হয়েছিল। মৃতার ছেলে সাবদুল শেখ বলেন, ‘আমার মা মারা গিয়েছেন। মা চোখ দান করেছেন কিনা সেটাও জানি না। মা যখন মারা যান, তখন আমি বাদকুল্লাতে।’ কোতোয়ালি থানার এক আধিকারিক জানান, মৃতার দু’জন ছেলে বাইরে থাকেন। তাঁরাই আমাদের জানিয়েছেন যে মা কবে চোখ দান করেছেন, তা তাঁরা জানেন না।