এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। শারীরিক চলন-বলন শামুক গতির। সংলাপ বলার সময়ও শান্ত, স্নিগ্ধ। আর কখনও কখনও স্রেফ গভীর দৃষ্টিপাত। কত কথা যেন বলে যান চোখ দিয়েই। ভাইজান ওরফে সলমন খানের স্টারডমের মূল পুঁজি এগুলোই। আর এই পুঁজি তিনি বিনিয়োগ করেন এমন এক অবাক পৃথিবীতে, যেখানে বাস্তবতা ও যুক্তিবোধকে অগ্রাহ্য করে শুরু হয় কল্পকাহিনির মায়াবী উড়ান। ‘সিকান্দর’ ছবিতে ভাইজানের এই একান্ত নিজস্ব পৃথিবীর সাক্ষী থাকলেন দর্শক। এর জন্য পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার এ আর মুরুগাদোসকেও তাঁর পরিচিত মানদণ্ডে বেশ কিছু কাটছাঁট করতে হয়েছে। কেবল বিপুল অনুরাগীর সংখ্যা মাথায় রেখে।
এক বিমান যাত্রায় মন্ত্রী প্রধানের (সত্যরাজ) পুত্র অর্জুন (প্রতীক পাতিল) এক মহিলার সঙ্গে আপত্তিকর আচরণ করে। সঞ্জয় রাজকোট ওরফে সিকান্দর (সলমন খান) তাকে উপযুক্ত সহবত শেখায়। এরপর শুরু হয় প্রধানের সঙ্গে সিকান্দরের দীর্ঘমেয়াদি লড়াই। এর মধ্যে সিকান্দরের অন্তঃসত্ত্বা চিত্রকর স্ত্রী সইশ্রীর (রশ্মিকা মান্দানা) বোমা বিস্ফোরণে অকালমৃত্যু। তার মরণোত্তর অঙ্গদানে লাভবান প্রাপকদের খুঁজে বের করে সিকান্দর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এর মধ্য দিয়ে দুর্বৃত্তদের দিয়ে ঘেরা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সূচনা। সবমিলিয়ে ‘সিকান্দর’ নাগরিক অধিকার লাভের এক ধুন্ধুমার ও জমজমাট গল্প।
পরিচালক দৃশ্যগত রূপকগুলির চমৎকার ব্যবহার করেছেন। এছাড়া, গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যক্রমগুলিকে সিঙ্গেল টেকে ক্যামেরাবন্দি করার নীতি ভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। তিরুর সিনেমাটোগ্রাফিতে নৃশংসতার এক অভিনব সৌন্দর্য ও পরিভাষা আবিষ্কৃত হয়েছে। এক্ষেত্রে বিবেক হর্ষলের সম্পাদনার মাত্রাজ্ঞানও প্রশংসনীয়। এই ছবির সাউন্ড ডিজাইনিং স্বতন্ত্র উল্লেখের দাবি রাখে। প্রতিটি ধ্বনির উড়ান মনের গভীরতম প্রদেশে সঠিকভাবে অবতরণ করেছে। দক্ষ প্রোডাকশন ডিজাইনের ফলেই কল্পনা বিলাসের সার্থক চিত্রায়ণ সম্ভব হয়েছে। বাণিজ্যিক মশলা প্রয়োগ করেও সার্থক শিল্প রন্ধন সম্ভব তার প্রমাণ করে এই সিনেমা। এবিষয়ে হলিউডি মাস্টারপিস ‘দ্য ডার্ক নাইট’-এর শক্তিশালী ভারতীয় উত্তর হল এই ছবি। কাহিনিও ভালো। আগামীতে স্টারডম ও বাণিজ্যিক ছবি সংরক্ষণের রূপরেখা নির্ধারণও করে ফেলেছে এই ছবি।
তবে বেশ কিছু জায়গায় সমস্যাও রয়েছে। পর্দায় রশ্মিকার সঙ্গে সলমনের রসায়ন তেমন জমেনি। বয়সের ছাপ ঢাকার প্রয়াস থাকলেও তা অনেকক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রধানের চরিত্রে সত্যরাজের চড়া মাত্রার অভিনয় এবং সিকান্দরের সহায়ক অমরের চরিত্রে শরমন যোশীর বৈচিত্র্যহীন অভিনয় বেমানান। এই ছবি শুধুই ভাইজানের ছবি। আটাশ মিনিটের ম্যারাথন ক্লাইম্যাক্সে ব্যবহৃত সমস্ত বাণিজ্যিক উপকরণের মধ্যেও তাঁর স্টারডমই প্রধান। এই ছবিতে ব্যবহৃত একটি আয়না দৃশ্যে সলমন তর্কযোগ্যভাবে তাঁর কেরিয়ারের একক শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, যেখানে শুধু চোখের একটি দৃষ্টি নিক্ষেপেই তিনি তাঁর অভিনীত চরিত্রের বহুস্তরীয় কক্ষপথকে পরিক্রমা করে নিয়েছেন।