সংবাদদাতা, রামপুরহাট: মঙ্গলবার শীতল ষষ্ঠীতে পাইকরে বাণব্রত বা ভক্তমারা উৎসব উপলক্ষ্যে কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটল। এই গ্রাম সহ আশপাশের বহু মানুষের কাছে এটিই প্রধান উৎসব। এই দিনটির জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন তাঁরা। বসে মেলাও। জানা গিয়েছে, বহুকাল ধরে শ্রীপঞ্চমী অর্থাৎ সরস্বতী পুজোর পরদিন শীতল ষষ্ঠীতে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। এবার ভক্ত হয়েছেন প্রায় ১১০ জন। প্রধান ভক্ত হয়েছেন দিয়াসিন বিল্টু পাল। এদিন সকালে গ্রামের বুড়ো শিবমন্দিরের সামনে ভক্তিভরে প্রণাম করে ‘কাচ বন্ধন’ করেন ভক্তরা। পরে উত্তরবাহী পাগলা নদীতে স্নান করতে যান তাঁরা। ঢাকের বাজনা আর কয়েক হাজার মানুষের কলরবে গোটা গ্রাম মুখরিত হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে ভক্তের ঝোঁক আসে এবং তাঁরা মৃতপ্রায় অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে শিবের ঘটের জল ছিটিয়ে তাঁদের চেতনা ফেরানো হয়। ফের সকল ভক্ত একসঙ্গে নদীতে স্নান করতে নেমে শিবশিলা তুলে এনে পাড়ে পুজো করেন। তাঁদের কোমরে বাঁধা তুলসী পাতা দিয়ে তাঁরা পুজো নিবেদন করেন। অন্যান্য জায়গায় বেলপাতা দিয়ে শিবের পুজো হলেও বুড়ো শিবের পুজো হয় তুলসী পাতা দিয়ে। দুপুরের দিকে শিবমন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি করা উঁচু মঞ্চে দিয়াসিনকে জড়িয়ে ধরে তাঁর জিভ বড় সূঁচ দিয়ে ফুঁড়ে দেন গ্রামের কর্মকাররা। সেই সময় হাজার হাজার মানুষের জয়ধ্বনি ও প্রচুর ঢাকের আওয়াজে এক আধ্যাত্মিক ভাবাবেগের সৃষ্টি হয়। এরপরই শুরু হয় ষষ্ঠীর ব্রতকথা। পরে সকলে আসেন খ্যাপাকালী মন্দির প্রাঙ্গণে। সেখানে তিনটি কলাগাছ দিয়ে তৈরি কাঠামোতে তিনটি বলির দা সাজানো হয়। দিয়াসিন দৌড়ে এসে লাফ দিয়ে সেই দা এর উপর দাঁড়িয়ে পড়েন। ওই অবস্থায় পুরো গ্রাম প্রদক্ষিণ করে খ্যাপাকালী মন্দির প্রাঙ্গণে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে অগ্নিকুণ্ডে ভক্তদের ঝাঁপানোর মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হয়। মুর্শিদাবাদ থেকে উৎসব দেখতে আসা শচীদুলাল দাস বলেন, যতই কাজ থাকুক, এই দিনটিতে ভক্তমারা উৎসব দেখতে পাইকর আসা চাই-ই।
Advertisement
বুড়ো শিবমন্দির প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন দেবদেবীর মূর্তি সংরক্ষণের জন্য সরকারি উদ্যোগে মিউজিয়াম তৈরির দাবি তুলেছেন গ্রামবাসীরা। রয়েছে মনসা, গণেশ, শীতলা, সূর্য, হনুমান, রামচন্দ্র, নৃসিংহ অবতার ও নানান রকমের দেবদেবীর মূর্তি। গ্রামে ঢোকার মুখে রয়েছে একটি ষাঁড়ের মূর্তি। ষাঁড় শিবের বাহন। সেই জন্য এলাকার নাম বুড়ো শিবতলা। মন্দিরে দেখা যায়, প্রায় তিন ফুট উচ্চতার সিমেন্টের বেদীর উপর পাঁচ মিটার অংশ জুড়ে পঞ্চাশটির বেশি ছোট-বড় মাপের কষ্টি পাথরের শিলা মূর্তি দাঁড় করানো আছে। এলাকায় রয়েছে নরসিংহ মূর্তি। রাজা কর্ণদেব এবং বিজয়সেনের আমলের দু’টি শিলালিপি এখানে রয়েছে। এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাসের সাক্ষী সংরক্ষণের দাবি এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের। এই উৎসব কমিটির যুগ্ম সম্পাদক তথা খ্যাপাকালী মন্দিরের সেবাইত দেবাশিস রায় বলেন, সেন ও পাল বংশ থেকেই এই ভক্তমারা উৎসব হয়ে আসছে।



