ড. সায়ন্তন মজুমদার: ফাল্গুনের মহাশিবরাত্রিতে শিশু ভোলানাথ হতে যেন আবার বরে পরিণত হন শিব ঠাকুর। এই রাত প্রকৃতপক্ষে হরগৌরীর বিবাহরজনী। এখন বিয়ের মরশুমে ফটো, ভিডিও, ড্রোন ক্যামেরার রমরমা। তখন সেসব না থাকলেও তাঁদের সাত পাকে বাঁধা পড়ার ইতিকথা নানা সূত্র হতে জানা যায়।
নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে আমরা পাত্র ও পাত্রীপক্ষের দুজন প্রতিনিধিকে নির্বাচন করেছি। উভয়েই কবি এবং তাঁদের উপাধি ছিল কবিচন্দ্র। প্রথমজন সপ্তদশ শতাব্দীতে ‘শিবায়ন’ কাব্যকার, হাওড়াবাসী রামকৃষ্ণ রায়। পাত্রীপক্ষরূপে রয়েছেন চণ্ডীকেন্দ্রিক ‘বাশুলীমঙ্গল’ খ্যাত ষোড়শ শতাব্দীর মুকুন্দ মিশ্র। তুলনায় পাত্রীপক্ষের বর্ণনাই অধিক প্রাচীন।
মুকুন্দ মতে, গৌরীর সঙ্গে কথা বলে শিব বশিষ্ঠ মুনিকে বিবাহের সম্বন্ধ করতে হিমালয়ের কাছে পাঠান। এদিকে রামকৃষ্ণকথায় হিমালয়ের দিক থেকে বিয়ের কথা পাড়তে শিবের কাছে আসেন শতকুম্ভ নামে এক পর্বত। দুটিই দুই শতকের কাব্য হলেও এক্ষেত্রে পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠেছে। রামকৃষ্ণ শিবের, মুকুন্দ বর্ণনা করেছেন গৌরীর অধিবাসের কথা। রামকৃষ্ণের কৈলাস তখন সমবেত সকল দেবদেবীর উপস্থিতিতে ব্রহ্মার বেদগান, দেবী মঙ্গলগীতে গীতিময়। নানা বস্তুযোগে শিবের অভিষেক সম্পন্ন হয়। বিশ্বকর্মা রত্নটোপর, শুক্রাচার্য এবং সূর্যদেব কাপড়-অলংকার, নারদ শশিকলা তিলক ও পারিজাতমালা, ইন্দ্র পাদুকা পরিয়ে দেন শিবকে। হাতের মণিবন্ধে ভৃগুমুনি বেঁধে দেন মঙ্গলসুতো।
গোধূলিকালে গৌরীর অধিবাস ও তুলা লগ্নে ‘বিভা’ অর্থাৎ বিয়ে হওয়ার কথা। নারদ-কুবের-বিশ্বকর্মার উপর ব্রহ্মা হিমালয়গৃহে তত্ত্ব পাঠানোর দায়িত্ব দেন। সকল দেবী গিরিরাজের গৃহে চলে এলে মেনকা গৌরীর অধিবাসের প্রস্তুতি নেন। সকল ঋষির উপস্থিতিতে বশিষ্ঠপত্নী অরুন্ধতী তাঁর হাতে পরিয়ে দেন মঙ্গলসুতো। আপামর হিমালয়বাসীর আনন্দ, নান্দীমুখের কথা মুকুন্দ লিখেছেন। গৌরীর গায়ে-হলুদের সময় এক নকল পুকুর কেটে মাঝখানে শিলা রেখে তাতে তাঁকে বসানো হয়—‘চারি দিগে চারি কলা পুখুরের মাঝে শিলা/তদুপর বসিল ভবানী।।’ রামকৃষ্ণ নানা বাদ্যযন্ত্র, উলুধ্বনি, গন্ধদ্রব্য, পঞ্চামৃত, পঞ্চগব্য, পঞ্চরত্ন, পঞ্চ কষায়, সর্বতীর্থজল, সর্বৌষধি, সহস্রধারা দিয়ে ‘উদ্বর্তন’ অর্থাৎ সেগুলি গায়ে লেপন করে স্নানের কথা লিখেছেন। দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য নাকি তাঁর অধিবাস করেছিলেন।
মুকুন্দ যুবতীদের জলসহার কথা আগে লিখে পরে অধিবাসের কথা লিখেছেন। কিন্তু রামকৃষ্ণ তার পালটা করেছেন। শিবের বিয়ে দেখতে আসা সকলের সঙ্গে অলক্ষ্মীও চলে আসায় গোল বাঁধে। তাকে অন্যান্য দেবীরা তখন ভাগিয়ে দেন। বিয়েবাড়িতে এরকম ছোটোখাটো গোলযোগ যেমন হয় আর কী! জল সাজতে গিয়ে গঙ্গায় পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে মেনকা অশোক গাছকে আলিঙ্গন ও পানের বরোজ, গোয়ালঘর, ধোপার পাটে পুজো সারেন। যাতে হরগৌরীর সংসার শোকরহিত হয়। সেখানে দুধভাত,কাপড়ের যেন অভাব না থাকে। সর্বোপরি ‘গৌরী যেন হয় হরের মুখের তাম্বুল’।
বরবেশ প্রসঙ্গেও দুই কবির বৈপরীত্য চোখে পড়ে। পাত্রীপক্ষের দাবি, শিব চিরাচরিত বিরূপ বেশে বিয়ে করতে চলে আসেন। গৌরী নারদকে ডেকে শিবকে এই বিষয়ে সচেতন করেন। অর্থাৎ বিয়ের আগেই বৌয়ের প্রভাব বিস্তার। ম্যাজিকের মতো কাজ হয়ে যায়। পাত্রপক্ষীয় রামকৃষ্ণের কথায় শিব কিন্তু প্রথমে মদনমনোহর বেশেই উপস্থিত হয়েছিলেন। ষাঁড়ের পিঠে সিংহাসনে বসা, পদ্মাসনে পা রাখা তাঁর শারীরিক সৌন্দর্য অধুনাতন জিমপ্রাণ পুরুষদেরও হার মানাবে। পরনে আগুনরঙা পোশাক, গলায় মণিমালা, হাতে বরাভয় ও পরশু। বিরাট বরযাত্রী নিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন হিমালয়ভবনে।
মেনকা বিশ্বকর্মার তৈরি রত্নময় ছায়ামণ্ডপে রাখা সোনার বেদিকায় মঙ্গলঘট স্থাপন করেন। হিমালয় ব্রহ্মাবিষ্ণুকে গড় হয়ে প্রণাম করলেও হবু জামাতা বলে শিবকে মনে মনে শত প্রণাম জানান। আশ্চর্যের বিষয় শিবের পূর্বতন শ্বশুর দক্ষ বরযাত্রীর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। দেবগুরু বৃহস্পতির স্ত্রী তারার নেতৃত্বে এয়োস্ত্রীরা শিবকে ‘ছাণ্ডলা’,‘ছান্দলা’ বা ছাঁদনাতলায় নিয়ে এসে পা ধুইয়ে দেন। ভৃগু ও নারদের কাঁধে হাত দিয়ে শিব ছাঁদনাতলায় দাঁড়ান। হিমালয়ের জামাতা-অর্চনা সাঙ্গ হলে মৈনাক হবু জামাইবাবুকে অন্দরে নিয়ে যান।
তখনই ঘটে যায় একটি বিপদ। দোজবর বলে এয়োদের মধ্যে শিবকে নিয়ে উপহাসের ছড়াছড়ি ঘটে। হরবরণের সময় শিব হঠাৎ করে দিগম্বর বেশ ধারণ করেন। গৌরী তখন নন্দীর মাধ্যমে শিবের কাছে খবর পাঠান। ভাবী স্ত্রীর অনুরোধ আদেশরূপে গণ্য করে শিব ত্রৈলোক্যমোহন রূপ ধরেন। নানা স্ত্রী-আচারে তাঁকে বরণ করেন মেনকা। মুকুন্দের কথায়,‘মেনকা বরিল শিবে পায়ে দিয়া দধি।’
এরপর চতুর্দোলা বা পালকিতে গৌরীকে নিয়ে আসা হয় শিবের কাছে। মাথার উপরে ‘চন্দ্র আচ্ছাদন’ বা চাঁদোয়া দিয়ে ঢেকে গৌরী শম্ভুকে সাতবার প্রদক্ষিণ করেন। তাঁদের চারি চোখের ‘ছামনি’ অর্থাৎ শুভদৃষ্টি হয়, সঙ্গে পুষ্পবৃষ্টি। রামকৃষ্ণকথনে ‘চারি চক্ষে চাহিআ বদন কৈল মালা’ অর্থাৎ মালাবদল হল। মুকুন্দবচনে ‘হরিল দুহাঁর মন নাচনে নাচনে।/ মাল্য দিয়া ভগবতী বরে ত্রিলোচনে।।’
নারদের হাত ধরে ছাঁদনাতলায় বসেন শিব। মৈনাক ভগিনীকে শিবের সামনে বসিয়ে দেন। ঘটের উপর পাত্রপাত্রীর হাত রেখে কন্যার হাতে জল দিয়ে কন্যাদান করেন হিমালয়। অতঃপর ‘শঙ্কর আপন হাথে সিন্দূর দিলেন সিঁথে/...আচ্ছাদন দিল শিরে’। বহু দানসামগ্রী দেন হিমালয়।
রামকৃষ্ণের বিবাহ কথামৃত অনুসারে পরদিন সকালে নকল পুকুর বানিয়ে স্নান করিয়ে হরগৌরীর কুশণ্ডিকা সাঙ্গ হয়। হিমালয় ভবিষ্যতের জন্য শিবকে খেলার মন্দার-গন্ধমাদন পর্বত, সশস্য জমি, গোধন, দাসদাসী, সোনারুপো, মণিরত্ন, পাঁচ ঘোড়ায় টানা সোনার রথ, স্বর্ণসিংহাসন, দিব্যপুরী যৌতুকরূপে তুলে দেন। সেদিন মেনকা নানা পদ রান্না করেন। পথে বেড়াতে গেলে বর দেখে সকল রমণী মোহিত হয়ে যায়, জেন জি-র ভাষায় যাকে ক্রাশ খাওয়া বলে। কালরাত্রি বিধিমতো পালন করেন বরকনে।
পরদিন সকালে ঋষিদের নিমন্ত্রণ করা হয়। এখনকার ব্রাইডাল মেক আপের চিত্র ধরা পড়ে গৌরীর প্রসাধন অংশে। তাঁর গাত্রমল দূর করে মহিলারা চন্দন, কস্তুরী, চুয়া কুমকুম, গন্ধরাজ তেল মাখানোর পরে কর্পূরের জল ঢালেন। মাথায় দেন আমলকি, মেথি। নানা অলংকার পরানোর পর দেহে ‘ক্ষৌম বস্ত্র পরাইল নিচোল উত্তরী।/নবীনযৌবনী দুর্গা সহজে সুন্দরী।।’ গৌরীকে তিন ঋষিপত্নী স্বামীভক্তির পাঠ পড়ান, স্বামীকে হাতছাড়া না করা থেকে শুরু করে শয়নেভোজনে কীরূপ ভূমিকা পালন করতে হবে ভালো করে বুঝিয়ে দেন। আজও কিন্তু কনের কানে এইসব মন্ত্র গুঁজে দেওয়া হয়। শিবের মতো নির্ঝঞ্ঝাট ঘর কিন্তু এখনও কনেপক্ষের কাম্য—‘গুরুর গঞ্জনা নাঞি স্বতন্তর ঘর।/শাশুড়ী ননদ নাঞি শ্বশুর দেবর।।’
এরপর নানারকম মুখশুদ্ধি, কর্পূরজল, মিষ্টি, সুগন্ধি দিয়ে অপ্সরারচিত ফুলশয্যার ঘরে গৌরীকে নিয়ে যাওয়া হয়। অরুন্ধতী নবসমাগমে শঙ্কিনী গৌরীকে ‘হরিষে বিবশ করহ জানি/ভয় না ভাবিহ ভামিনী’ বলে আশ্বস্ত করেন। শয়নমন্দিরে শিব তখন গৌরীর বিলম্বে ঘুমিয়ে গিয়েছেন বা ঘুমানোর অভিনয় করছেন। নানা উপায়ে এমনকি অধুনালুপ্ত পদসেবা করেও শিবকে জাগানোর চেষ্টা করেন। শিবও জেগে গিয়ে নববধূকে আদরপূর্বক ‘করে ধরি আনি বসাইয়া বাম পাশে।/রোহিণী শশাঙ্ক যেন উদয় আকাশে।।’ এবার শিবকে বাগে পেয়ে মহিলারা প্রহেলিকা বা ধাঁধা জিজ্ঞাসা করেন। সেগুলোর মধ্যে একটা এই সময়ে বেশ প্রাসঙ্গিক। স্বাহা দেবীর হেঁয়ালির উত্তরে শিব বলেছিলেন, ‘কৈটভের জ্যেষ্ঠ ভাই মাসের কনিষ্ঠ।’ উত্তর হবে মধু—দৈত্য কৈটভের বড়ো ভাই ও বারো মাসের শেষ মাস। ঋষিপত্নীরা রাত্রিতে নবদম্পতিকে নিভৃত অবকাশ উপহার দিয়ে চলে যান।
এরপর শয্যাতোলনী পর্ব। পরদিন সকালে দেবকন্যারা বিছানা পরিষ্কারের জন্য প্রত্যেকে পঞ্চাশ কাহন কড়ি ও একটি করে শাড়ি চান। সকলকে সন্তুষ্ট করেন আশুতোষ। হিমালয় এক মাস কনেজামাইকে রেখে দেন। নানা কুলাচার পালিত হয়। ভোগের পাশাপাশি যোগসাধনাতেও হরপার্বতীর যুগলসম্মিলন ঘটে। শেষে বিদায় নিয়ে রথে হরপার্বতী ফিরে আসেন সজ্জিত কৈলাসে। তারপর ‘ভুবনমোহন বেশে গোধূলি সময় দেশে/প্রবেশ হইলা কন্যা বরে।।’ ঘনঘন হুলাহুলি বা উলুধ্বনির মধ্যে কলসিকাঁখে শিবজায়া পতিগৃহে প্রবেশ করেন।
বিয়েতে নাচানাচি সেই সময়েও হত। নারদের সঙ্গে বিশাল ভুঁড়ি নিয়ে কুবেরের নাচ দেখে এখনকার মাসিকাকিদের মতো তখনও ‘স্ত্রীগণ হাসেন’। সেই সময় পাত্রপক্ষের খরচ অনেকটাই বেঁচে যেত। কারণ কনেযাত্রীর আপ্যায়ন সহ বৌভাতের প্রীতিভোজের ব্যবস্থা সম্ভবত ছিল না। যাই হোক,শেষে ‘পারিষদগণ গেলা নিজ নিজ স্থলে।/পার্বতীশঙ্কর কথা কহেন বিরলে।।’
অনিবার্যভাবে সেই ‘কথা’-র সূত্র ধরেই আসা কথা-কাটাকাটি হতে রেহাই পায় না হরগৌরীর সংসারও। রামকৃষ্ণের মতো অত বিস্তারিতভাবে না বলে মাত্র চব্বিশটি ছত্রে হর-গৌরী-বিবাহ বর্ণনা করেছিলেন মুকুন্দ—‘ক্ষীর ভোজন করে মহেশ শঙ্করী।/সুখে পুনু গেল যত নগরে নাগরী।।’ সবই যখন দ্রুত লয়ে চলতে থাকে তখন আশুতোষের সংসারেও দাম্পত্য কলহ আশুগতিতে আসতে দ্বিধা করে না। তাই রামকৃষ্ণ কবিচন্দ্রের লেখনীতে যা ছিল বহু দূরাগত, কবিচন্দ্র মুকুন্দ মিশ্রের কাব্যে যেন সহসা আগত। তবুও সবকিছুকে মেনে ও মানিয়ে নিয়ে আজও রমণীয় দাম্পত্যের পরাকাষ্ঠা হয়ে রয়েছেন শিবপার্বতী।
লেখক প্রাবন্ধিক ও গবেষক