নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কিছুদিন আগের ঘটনা। সকালে আচমকাই ফোন এল বয়স্কদের নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থার হেল্পলাইন নম্বরে। আমেরিকা থেকে ফোন করছেন জনৈক ব্যক্তি। বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগই করতে পারছেন না তিনি। কিছু হয়নি তো? অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর ওই প্রবাসীর বাবা-মায়ের বাড়ির দরজা ভাঙতেই দেখা গেল মর্মান্তিক দৃশ্য। একটি ঘরে বিছানায় সংঞ্জাহীন অবস্থায় পড়ে আছেন দম্পতি। স্ত্রী মারাই গিয়েছেন। স্বামীর নাড়ির গতি অতি ক্ষীণ। বৃদ্ধকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আর এক সমস্যা। দুই ছেলেই তো থাকেন বাইরে। একজন হায়দরাবাদ। অন্যজন আমেরিকা। এদিকে বাড়ির কেউ সইসাবুদ না করলে ভর্তি নিতেই চাইছে না হাসপাতাল। অনেক ঝকমারির পর ভর্তি হলেন। বেঁচেও গেলেন। কিন্তু স্বজনবিনা সেই বাঁচা যে বহু কষ্টের! ঘটনা হল, শহরের ৭০ শতাংশ সম্পন্ন পরিবারের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাই থাকেন আলাদা। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশের ছেলেমেয়েরা থাকেন বাইরে। হয় রাজ্যের বাইরে, নয়ত দেশের। আর ৯ শতাংশের ছেলেমেয়েরা শহরে থাকলেও বাবা-মা’র সঙ্গে থাকেন না। বয়স্কদের চিকিৎসকদের সংগঠন জেরিয়াট্রিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়া (রাজ্য শাখা) এবং বয়স্কদের চিকিৎসায় যুক্ত এক সংগঠনের যৌথ সমীক্ষা থেকে চোখে জল আনা এই সত্য বেরিয়ে এসেছে। দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন সম্পন্ন পরিবারের ৫০০ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে নিয়ে করা হয়েছিল এই সমীক্ষা। সমীক্ষাকারী চিকিৎসক ডাঃ ধীরেশকুমার চৌধুরি এবং তাঁর টিম সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, ছেলেমেয়ে বা পরিবারের সঙ্গে থাকছেন কলকাতার মাত্র ৩০ শতাংশ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। বাকি ৭০ শতাংশই থাকেন স্বজনের সঙ্গ ছাড়াই। তাঁদের মধ্যে সম্পূর্ণ একা থাকেন ১২ শতাংশ। স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে থাকেন বাকি ৫৮ শতাংশ। ২৮ শতাংশের সন্তান দেশে থাকলেও সেটা কলকাতার বাইরে। ২৬ শতাংশের সন্তান থাকছেন বিদেশে। ৯ শতাংশ শহরে থাকলেও ছেলেমেয়েদের থেকে আলাদা থাকেন। ৭ শতাংশ সন্তানহীন। তাই তেমনভাবে দেখারও কেউ নেই। টাকাই যে সব কিছু নয়, স্বজনের সঙ্গ, স্নেহ, ভালবাসা জীবনে কতটা জরুরি, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে এই সমীক্ষায়। দেখা যাচ্ছে সম্পন্ন বা গোদা বাংলায় পয়সাওয়ালা পরিবারের সদস্য হয়েও বয়সকালে ৩৫ শতাংশের জীবন কাটছে সেবাকর্মীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে। হয় আয়া, নয়তো নার্স অথবা পেশাদার সাহায্য ছাড়া তাঁদের জীবন চালিয়ে যাওয়াই মুশকিল। না হলে স্নান, খাওয়া, সময়ে ওষুধ দেওয়া, হঠাৎ মেডিক্যাল হেল্পের দরকার হলে লোকজন ডাকা—কে করবে তাঁদের জন্য! তাঁদের কেউ স্ট্রোকে আক্রান্ত, কারও হিপ বা ফিমার ফ্র্যাকচার, কেউ ভুগছেন ডিমেনশিয়া বা পারকিনসনসে। গত রবিবার ছিল বয়স্কদের চিকিৎসকদের সংগঠন জিএসআই-এর রাজ্য শাখার সম্মেলন। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪০০ জনের বেশি চিকিৎসক অংশ নেন। কীভাবে বয়স্করা সুস্থভাবে জীবন কাটাতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।



