সংবাদদাতা, বোলপুর: শান্তিনিকেতনের হেরিটেজ কোর জোন সংলগ্ন ফাঁকা এলাকায় একটি নির্মীয়মাণ রেস্তরাঁকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। হেরিটেজ কোর এলাকায় বাণিজ্যিকীকরণের জন্য বোলপুর পুরসভা রেস্তরাঁ তৈরির আদৌ কোনও অনুমতি দিয়েছে কিনা সেই প্রশ্ন তুলেছে বিশ্বভারতী। এর উত্তর চেয়ে পুরসভা ও শ্রীনিকেতন শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদকে (এসএসডিএ) চিঠিও দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। রেস্তরাঁর তিনদিকেই বিশ্বভারতীর জায়গা। স্বভাবতই, নিজেদের সীমানায় পাঁচিল দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাতেই যাতায়াত অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্বভারতীর বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছেন নির্মীয়মাণ রেস্তরাঁর মালিক। তিনি বিশ্বভারতী, পুরসভা, এসএসডিএ, শান্তিনিকেতন থানা সহ আরও অনেকে বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। এই ঘটনায় সরগরম বোলপুর-শান্তিনিকেতন।
যে জায়গাটিকে ঘিরে বিতর্ক, সেটি ছিল ধীরেন্দ্রমোহন সেনের। পরবর্তীতে তাদের থেকে সেই জায়গাটি বোলপুর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সুশান্ত ভকতের ছেলে বিকাশ ভকত কিনে নেন। এরপর সেখানে তিনি বহুতল রেস্তরাঁ তৈরি শুরু করেন। তাঁর দাবি, অনুমতি যখন পেয়েছিলেন তখন শান্তিনিকেতন হেরিটেজ স্বীকৃতি পায়নি। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট এলাকাটি পুরসভার। সেই কারণে সেখানে রেস্তরাঁ করার অনুমতি দিয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান পর্ণা ঘোষ। কিন্তু বিশ্বভারতীর দাবি, ওই জমি ‘আবাসিক’ চরিত্রভুক্ত। সেন পরিবার যখন ছিল বিশ্ববিদ্যালয় যাতায়াতে কখনই বাধা দেয়নি। কিন্তু বর্তমান জমির মালিক সেখানে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খুলতে চাইছেন। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের পরিপন্থী। বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের রাস্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস হতে পারে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজের সীমানা বরাবর পাঁচিল তোলে। আর তাতেই ওই রেস্তরাঁর যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়েছে বলে বিকাশবাবুর অভিযোগ। তার প্রেক্ষিতে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মামলা দায়ের করেন।
যদিও বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও সেটি বোলপুর পুরসভার অন্তর্গত নয়। এই জমি মূলত ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ এলাকায় রয়েছে। এ ধরনের বহু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বর্তমানেও রয়েছে। ফলে, পুরসভা আদৌ অনুমতি দিয়েছে কিনা বিশ্ববিদ্যালয় সে প্রশ্ন তুলেছে। কারণ, এরকমভাবে অনুমতি দেওয়া শুরু হলে আগামীদিনে অন্যান্যরাও ক্যাম্পাসের ভিতরে বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। সেক্ষেত্রে হেরিটেজ তকমা ধরে রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, তার দায় কে নেবে?
প্রসঙ্গত, এর আগেও, সঙ্গীত ভবন সংলগ্ন এলাকায় একটি রেস্তরাঁ নিয়ে হইচই পড়েছিল। রেস্তরাঁর পাশেই ছাত্রীদের হস্টেল। বিশ্বভারতীর অভিযোগ ছিল, ওই এলাকায় বহিরাগতদের যাতায়াতের ফলে ছাত্রীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। তা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় উঁচু পাঁচিল দিয়ে সীমানা সুরক্ষিত করে। এক্ষেত্রেও ধারাবাহিকভাবে পাঁচিল তোলার কাজ চলছিল। আর তাতেই যাতায়াত অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় মামলার পথে হাঁটলেন রেস্তরাঁর মালিক। তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালে রেস্তরাঁ করার অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন বর্তমান চেয়ারম্যান পর্ণা ঘোষ। বাসযোগ্য জমিতে বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা কি করা যায়? এর উত্তরে তিনি বলেন ‘রবীন্দ্র ভাবনায়’ ওই রেস্তরাঁ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’ যদিও পুরসভার চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি কোনও অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর করিনি। তাছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের পরিপন্থী কোনও কাজে পুরসভা অনুমোদন দেবে না। এই জটেই মামলা গড়াল হাইকোর্টে। যদিও ভারপ্রাপ্ত কর্মসচিব অশোক মাহাত বলেন, বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে, তাই কোনও মন্তব্য করব না। তবে, অতীতে সীমানা ঘেরার সময় যাঁরা রাস্তা চেয়ে আবেদন করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। এক্ষেত্রে তেমন কিছু হয়নি বলেই বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের সীমানা সুরক্ষায় পাঁচিল দিয়েছে। • নিজস্ব চিত্র