নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘তৃণমূলীকরণ’—এই শব্দটি ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে বাংলার রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু গত চারমাসে রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে পঞ্চায়েত প্রধান নির্বাচন পর্যন্ত, একগুচ্ছ ঘটনা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গেলেই, তাঁদের দলে নিয়ে নেওয়া হবে? আবার তৃণমূল জনপ্রতিনিধিদের সমর্থনেই পঞ্চায়েত স্তরে বোর্ড গঠন করতে হবে বিজেপিকে? রাজনীতির অলিন্দে ঘুরপাক খাওয়া এই প্রশ্নের পরিধি আরও বাড়িয়ে তুলেছে আসন্ন পুরসভার নির্বাচন। যেখানে রাজনীতির কারবারিরা অঙ্ক কষা শুরু করে দিয়েছেন, ‘মমতাপন্থী’ বিদায়ী তৃণমূল কাউন্সিলার কিংবা ‘ভালো তৃণমূলে’ শামিল হওয়া পুরসভার জনপ্রতিনিধিদের ভাগ্যে কি বিজেপির টিকিট মিলবে?
ইদানীং সময়কালের মধ্যে সবথেকে বড়ো ঘটনা বোধহয় রাজ্যসভার তিন আসনে নির্বাচন। তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন সুস্মিতা দেব, সুখেন্দুশেখর রায় ও প্রকাশচিক বরাইক। তাঁরা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। তারপরই তাঁরা বিজেপির টিকিটে ফের রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচন হয়ে যান। রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, এই ঘটনা কি বিজেপিতে ‘তৃণমূলীকরণ’ নয়?
পরের ঘটনা জেলায় জেলায় ‘ভালো তৃণমূল’-এর সৌজন্যে পঞ্চায়েত স্তরে বোর্ড গঠন। দেখা গিয়েছে, বীরভূম জেলায় তৃণমূলের সৌজন্যে দুটি পঞ্চায়েত সমিতি দখল করেছে বিজেপি। সিউড়ি-১ এবং সাঁইথিয়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন বিজেপির। তৃণমূলের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও দুটি ক্ষেত্রেই নির্বাচিত হলেন বিজেপির সদস্য। তৃণমূল সদস্যদের ভোটে পঞ্চায়েত সমিতি দখল করে বিজেপি। বীরভূমের মতো একই ঘটনা ঘটেছে নদীয়া জেলাতেও। নদীয়া জেলা পরিষদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় করেছে বিজেপি। ১৫ জন তৃণমূল সদস্যের সমর্থনে মাত্র ৬ জন বিজেপির সদস্য নিয়ে সভাধিপতি হলেন বিজেপির। কৃষ্ণনগর-১, কৃষ্ণনগর-২ এবং তেহট্ট পঞ্চায়েত সমিতি তৃণমূলের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। সেখানেও বিজেপির দখল! আবার নদীয়া জেলার ধুবুলিয়া-১, ধুবুলিয়া-২, সাধানপাড়া-২ প্রভৃতি পঞ্চায়েত তৃণমূলের হাত থেকে চলে গিয়েছে বিজেপির হাতে।
দিকে দিকে এই সমস্ত ঘটনাকে নিয়ে রাজনীতির কারবারিরা প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, বিজেপি নিজের সাংগঠনিক শক্তির জোরে নির্বাচনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বোর্ড গঠন করলেই তো ‘ভালো’ হত। তৃণমূল সদস্যের সমর্থনে বোর্ড গঠন ‘তৃণমূলীকরণ’ নয়? বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণ’ আদৌ বন্ধ হবে কি?
বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাতারাতি যাঁরা বিজেপিতে নাম লেখানোর তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছিলেন, তখন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছিলেন, বিজেপির তৃণমূলীকরণ হবে না। এই প্রেক্ষাপটে মমতাপন্থী তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, শমীকবাবুর কথা বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। উনি তোলাবাজি বন্ধ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু নানা জায়গা থেকে বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ আসছে। আবার তৃণমূলের সাংসদ, বিধায়ক, কর্মীদের ভাঙিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যে কাজটি বিজেপির হয়ে করছে পুলিশ। আগামী পুরসভা নির্বাচনে তৃণমূল থেকে দূরত্ব বাড়ানো একজনও ‘বেইমানকে’ বিজেপি যদি টিকিট দেয় তাহলে প্রমাণিত হবে যে বিজেপিতে যোগ্য লোক নেই।
যদিও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়ে দেন, স্বঘোষিত কিংবা হঠাৎ বিজেপি হয়ে গিয়েছেন কেউ কেউ। তাঁরা যদি ভাবেন হঠাৎ বিজেপির পতাকা নিয়ে ঘুরে কাউন্সিলার হওয়ার টিকিট পেয়ে যাবেন, তাহলে তাঁরা ভুল করছেন। প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য দলের নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো ও কমিটি রয়েছে। পাশাপাশি তাঁর মন্তব্য, সিপিএম ‘পরিত্যক্ত’ আর তৃণমূল ‘নির্মূল’। এখন ওরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করুক কে শক্তিশালী বিরোধী হবে।