


সংবাদদাতা, কাটোয়া: দুবাইয়ের আকাশজুড়ে শুধুই মিসাইলের ঝলকানি। টানা বিস্ফোরণের শব্দে তটস্থ মানুষ। সেখানেই আটকে পড়েছেন কাটোয়া মহকুমার দুই দম্পতি সহ সাত যুবক। তাঁদের কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। চরম উৎকণ্ঠায় তাঁদের পরিবার পরিজন।
কেতুগ্রামের বিল্লেশ্বরের যুবক রাকেশ শর্মা তাঁর স্ত্রী ববিতা সিংহকে নিয়ে দুবাইতে রয়েছেন। একবছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছে। রাকেশ গত চার বছর ধরে সেখানে একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। ববিতা সেখানকার একটি শপিং মলে কাজ করেন। এদিন রাকেশ বলেন, দুবাই এয়ারপোর্ট, শারজা এসব এলাকায় মুহুর্মুহু ড্রোন হামলা চলছে। মিসাইলও আছড়ে পড়ছে। আমাদের ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করে মোবাইলে মেসেজ পাঠাচ্ছে এখানকার প্রশাসন। আতঙ্ক তো রয়েছেই। ববিতার মা চন্দনা সিংহ বলছেন, মেয়ে-জামাই মিসাইলের ছবি পাঠাচ্ছে। এসব দেখে আমরা কী করে নিশ্চিন্ত থাকি বলুন তো। ওরা সুস্থ ভাবে দেশে ফিরুক এটাই চাই।
এদিকে মঙ্গলকোটের ধারশোনা গ্রামের যুবক আবদুল সেলিম শেখ দুবাইতে শারজা ইন্ডাস্ট্রিয়াল-২ এলাকায় একটি গাড়ি সার্ভিস সেন্টারে কাজ করেন। আবদুল সেলিম বলছেন, আমরা রাতে ঘরে এসে সবে রান্না চড়িয়েছি, এমন সময়ে বিকট শব্দে পুরো বিল্ডিংটা কেঁপে উঠল। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি আমাদের এলাকা থেকে কিছুটা দূরেই মিসাইল এসে পড়েছে। রাস্তায় আগুন জ্বলছে। আমাদের সঙ্গে অন্য যারা থাকে, তাদের সংস্থা থেকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। বলেছে দেশে ফিরে যেতে। কিন্তু এখন তো বিমান পরিষেবা বন্ধ।
সেলিমের বাড়িতে রয়েছেন বাবা হারাধন শেখ, মা মেহেরুন্নেসা বিবি। মেহেরুন্নেসা বলেন, ছেলেটা ভালো না থাকলে আমরা কী করে ভালো থাকি। সেখানে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, আমরা বাড়িতে টিভি খুলে বসে আছি। কখন যুদ্ধ থামবে, ছেলেরা বাড়ি ফিরে আসবে। মঙ্গলকোটের বিধায়ক অপূর্ব চৌধুরীর সঙ্গে আমরা দেখা করেছি। বিধায়ক বলেন, আমরা রাজ্য সরকারের উচ্চ দপ্তরে জানাব, যাতে আমাদের এলাকার ছেলেরা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে তার ব্যবস্থা করতে।
এদিকে পূর্বস্থলী-২ ব্লকের গাছা এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান শেখও দুবাইতে রয়েছেন। তিনি বলছেন, চোখের সামনে মিসাইল হামলা দেখব, এমন কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। বুর্জ খলিফা থেকে আগের দিন সব খালি করে দিয়েছিল। আমরা দেখে এসেছিলাম। এখন রাতে ঘুম আসছে না। যেভাবে বহুতলগুলোতে মিসাইল এসে আছড়ে পড়ছে, বেঁচে ফিরতে পারলে হয়।
নয়াচরের বাসিন্দা রাহুল মণ্ডল উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেই দুবাইতে নির্মাণ সংস্থায় কাজে গিয়েছিলেন দেড় বছর আগে। তাঁর বাবা বিশ্বনাথ মণ্ডল দিনমজুর। মা চম্পা মণ্ডল রান্নার কাজ করেন। বাবা-মায়ের অভাব ঘোচাতে রাহুল দুবাইয়ে গিয়েছিলেন। এখন জীবন বাঁচানোর কথা ভাবছেন। রাহুল বলছেন, ভেবেছিলাম বাবা-মাকে আর বেড়ার বাড়িতে থাকতে দেব না। কিন্তু যেভাবে মিসাইল হামলা হচ্ছে, তাতে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারলেই যথেষ্ট। কালো ধোঁয়ায় সকালেই মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে আকাশ। বারুদের গন্ধে ভরে যাচ্ছে চারপাশ। রাস্তায় বের হলেই আগুনের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। কতদিন ঘরে বন্দি হয়ে থাকব জানিনা। বিশ্বনাথবাবু বলছেন, আমি দিনমজুরের কাজ করি। বহু কষ্ট করে ছেলেটাকে পাসপোর্ট করে দুবাইতে পাঠিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ছেলেটা ভালো রোজগার করবে। আমাদের আর হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হবে না৷ এখন ফোনে ছেলে বলছে, বাবা বাড়ি ফিরতে চাই। এসব শুনে মন কি আর ভালো থাকে। কাটোয়ার বিজয়নগরের এক দম্পতিও দুবাইতে আটকে।