এক চিলতে গলিতেই পর পর সাত দুর্গা! খয়রাশোলের পাথরকুচির প্রাচীন পুজো
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: বীরভূমের খয়রাশোল ব্লকের পাথরকুচি গ্রাম। মূলত কাঁসা-পিতলের বাসনের ঠুকঠাক আওয়াজেই এই গ্রামের পরিচিতি। কিন্তু দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে এই গ্রামের কর্মকার পাড়ায় তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত আবেশ। গ্রামের একশো মিটারের এক চিলতে সঙ্কীর্ণ গলিতে পা রাখলেই চোখে পড়ে এক বিরল দৃশ্য। পাশাপাশি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাত-সাতটি দুর্গাদালান! কোনও জমিদার বা রাজরাজড়ার অহংকার নয়, স্রেফ সাধারণ মানুষের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই বিশাল আয়োজন জেলার নিরিখে এক অনন্য নজির।

Advertisement

গ্রামের প্রবীণদের কথায়, কয়েক’শ বছরের প্রাচীন এই পুজো। কর্মকার সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষ গদাধর কবিরাজ একটি দুর্গা ও একটি কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করে পুজোর সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে পরিবারের বংশবৃদ্ধি এবং শরিকি বিভাজনের কারণে সেই পুজো ভেঙে আজ সাতটি হয়েছে। তৈরি হয়েছে আলাদা আলাদা মন্দিরে। গ্রামের বাসিন্দা আগমন কবিরাজের কথায়, 'প্রথমে একটি মন্দিরই ছিল, কালক্রমে বংশ বাড়তে বাড়তে আজ সাতটি মন্দির দাঁড়িয়েছে। তবে সাতটি মন্দির হলেও, পুজোর রীতিনীতি বা ভক্তিতে এতটুকুও ছেদ পড়েনি।'
সপ্তমীর ভোরে সাতটি দোলা কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে যখন একসঙ্গে হিংলো নদীতে স্নানে যায়, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হন আপামর গ্রামবাসী। অষ্টমী ও নবমীতে প্রতিটি মন্দিরে সাদা পাঁঠা বলিদান হয়। তবে এই পুজোর সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রথাটি হল বলি বিসর্জন। আগমন কবিরাজ জানান, 'অষ্টমীর বলির সামান্য রক্ত মাংস মাটির সরায় তুলে রাখা হয়। গভীর রাতে একটি ভেলায় রক্ত, মাংস, খৈ, বাতাসা, নাড়ু এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে সেটিনদীতেভাসানো হয়। সাতটি পুজোয় বলির সাতটি খড়্গ নিয়ে সেটি নদীতে ভাসিয়ে আসেন ১৪ জন। প্রাচীন বিশ্বাস মেনে, ওই নৈবেদ্য ভাসিয়ে ফেরার পথে কেউ আর পিছন ফিরে তাকান না।'
প্রায় তিনশো ঘর কর্মকার নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই পুজোর ব্যয়ভার বহন করেন। পরিবারের সদস্য কাজল কান্তি রায় বলেন, 'মায়ের পুজোর জন্য আমাদের প্রচুর খরচ, তাই কার্তিক মাস থেকেই আমরা টাকা জমাতে শুরু করি। সরকারের কাছ থেকে কোনো সাহায্য নিই না, নিতে চাইও না। খবর পেয়ে একসময় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও আমাদের এই পুজো দেখতে এসেছিলেন।'
পুজোর ক’টা দিন গোটা গ্রাম আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে গমগম করে। সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণা টুনু কবিরাজ বলেন, 'বসে বসেই সব দেখি, ছেলেমেয়েরা আনন্দ করে, খুব ভালো লাগে।' নবীন প্রজন্মের সম্পূর্ণা কবিরাজের কাছে পুজো মানেই স্থানীয় মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাচ, গান আর আবৃত্তির আসর। প্রবীণ লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডলের কথায়, 'আধুনিকতা এলেও আমাদের প্রাচীন রীতিনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।'
বংশ পরম্পরায় এখানকার প্রতিমা তৈরি করে আসছেন মৃৎশিল্পী নিশাপতি সূত্রধর। তিনি বলেন, 'এইখানে সাতটা প্রতিমা হয়, আমি একাই পাঁচটা তৈরি করি। আমার দাদু-বাবারাও এই কাজ করেছেন, আমিও করছি।' দশমীর দিনেও থাকে এক চমক। একসময় কাঁধে করে সাতটি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলেও, এখন ট্রাক্টরে চেপে হিংলো নদীতে একসঙ্গে সাত দুর্গার বিসর্জন হয়। প্রাচীন প্রথা ও আন্তরিকতার এমন মেলবন্ধনই পাথরকুচির পুজোকে করে তুলেছে চিরন্তন।