Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

আত্মভোলা বিজ্ঞানী

আমাদের দেশের বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু। এ কথা স্বীকার করতেই হয় যে, বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান তত্ত্বের সাপেক্ষে গোটা বিশ্বেই তিনি সুপরিচিত।

আত্মভোলা  বিজ্ঞানী
  • ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণাল শীল: আমাদের দেশের বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু। এ কথা স্বীকার করতেই হয় যে, বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান তত্ত্বের সাপেক্ষে গোটা বিশ্বেই তিনি সুপরিচিত। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার প্রাক্কালে সত্যেন্দ্রনাথের ছাত্র জীবনেও তাঁর অনন্য মেধার স্বাক্ষর পাওয়া যায়। ১৯১১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ১৯১৩ সালে গণিতের স্নাতক এবং ১৯১৫ সালে মিশ্র গণিতে মাস্টার্স, উভয় পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স বা স্নাতকোত্তরের পরীক্ষায় তাঁর পাওয়া শতকরা ৯২ শতাংশ নম্বর প্রাপ্তির রেকর্ড বর্তমানের বহুল নম্বর প্রাপ্তির যুগেও কেউ ভেঙে উঠতে পারেনি। ১৯১৫ সালে স্নাতকোত্তর এর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তাঁর শিক্ষক ডি এন  মল্লিক মজা করে বলেছিলেন, ‘এত বেশি নম্বর পেয়েছ পরীক্ষায়! বড় বেমানান লাগছে হে।’ যাইহোক এমএসসি পাস করার পর স্বভাবতই তিনিও অন্যান্যদের মতো চাকরির চেষ্টা শুরু করেন। তাঁর বাবা সুরেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন সেই সময় ভারতীয় রেলের হিসাব রক্ষক। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে চেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথকে রেলে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে। কিন্তু তিনি সেই চাকরি করতে চাননি। এই সময় পাটনা কলেজে শিক্ষকতার জন্য তিনি আবেদন করেন। সেখানকার প্রিন্সিপাল উইলসন সাহেব তাঁর আবেদনপত্র দেখে জানান, সত্যেন্দ্রনাথ যদি মাস্টার্সে প্রথম বিভাগে পাস না করে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করতেন, তাহলে হয়তো তাকে পাটনা কলেজে শিক্ষকতার চাকরিটি দেওয়া যেত। তখন সত্যেন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন, এত ভালো রেজাল্ট করে প্রথম বিভাগে পাশ করার চেয়ে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করলেই বোধ হয় ভালো হত। এরপর তিনি তাঁর বাবার এক বন্ধুর পরামর্শে আলিপুর হাওয়া অফিসে চাকরির জন্য আবেদন করেন। সেখানেও এই বিখ্যাত বিজ্ঞানীকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করা হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এরকম একজন কৃতী ছাত্রের উপযুক্ত চাকরি সেখানে নাই। প্রার্থী যদি অন্য কোথাও আবেদন করেন তবে ভালো হয়। যাইহোক শেষমেশ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অনুরোধে কলকাতার রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে শিক্ষাদান শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পদে যোগদান করেন।

Advertisement

বিশিষ্ট এই বিজ্ঞানী ছিলেন আত্মভোলা মানুষ। এইরকম একটা ঘটনার কথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহকর্মী কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিচারণ থেকে পাওয়া যায়। সত্যেন্দ্রনাথ বসু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একদিন বাড়িতে তাঁর মেয়ে বায়না ধরলেন যে, সিনেমা দেখতে যাবে। সত্যেন্দ্রনাথ তখন গণিতের এক জটিল সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত। তিনি কিছুতেই তখন মেয়ের সঙ্গে যেতে রাজি নন। শেষে মেয়ের অনেক জোরাজুরিতে রাজি হলেন। মেয়েকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে গেলেন মুকুল সিনেমা হলে। গাড়ি থেকে নেমে গাড়োয়ানকে টাকা দিতে গিয়ে দেখেন, টাকার ব্যাগটা ফেলে রেখে এসেছেন বাড়িতে। চিন্তিত মুখে মেয়েকে বললেন, ‘তুই এখানে একটু অপেক্ষা কর মা, আমি বাসায় গিয়ে টাকার ব্যাগটা নিয়ে আসি।’ একই ঘোড়ার গাড়িতে ফিরে এলেন বাড়িতে। নিজের টেবিলের উপর থেকে টাকার ব্যাগ তুলে নিতে গিয়ে নজরে পড়ল সেই গাণিতিক সমস্যাটার দিকে। সব ভুলে গিয়ে তিনি বসে পড়লেন সেই সমস্যার সমাধানে। এদিকে সময় চলে যাচ্ছে। গাড়োয়ান তো অপেক্ষা করেই চলেছে। সে সাহস করে বাড়ির ভেতর গিয়ে ডাকতেও পারছে না। এত বড় বিজ্ঞানীর বাড়িতে গিয়ে কি ডাকাডাকি করা চলে। কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক পরও যখন সাহেব ঘর থেকে বেরলেন না, তখন একরকম বাধ্য হয়েই গাড়োয়ান সাহস করে ঘরে ঢুকে দেখল, সত্যেন বসু চেয়ারে বসে অঙ্ক করে চলেছেন নির্বিকারভাবে। গাড়োয়ানের ডাকে চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ব্যাপার?’
গাড়োয়ান কাচুমাচু হয়ে বলল, ‘আপনি টাকা নিয়ে সিনেমা হলে যাবেন বলেছিলেন, আপনার মেয়ে সেখানে অপেক্ষা করছেন।’ এবার সত্যেন বসু সংবিৎ ফিরে পেলেন, ‘তাই তো, বড্ড ভুল হয়ে গেছে।’ ১৯৭৪ সালের এমনই এক ফেব্রুয়ারি মাসে এই বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর জীবনাবসান হয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ