নিজস্ব প্রতিনিধি, বিধাননগর: ‘শ্রাবণের ধারার মতো, পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে’। উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে চলেছেন বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র। পরণে সিকিউরিটি গার্ডের শক্ত পোশাক। হাতে পুরানো গীতবিতান। সোশ্যাল মিডিয়ার সৌজন্যে গত কয়েকদিনে এই ভিডিয়ো দেখে ফেলেছেন অনেকে। বিশ্বকবির গান গেয়ে রাতারাতি ভাইরাল হয়েছিলেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই প্রাক্তনী তথা সিকিউরিটি গার্ড শোভন চক্রবর্তী। লাইক, শেয়ার, কমেন্টের বন্যা। কিন্তু, রবি ঠাকুরের গান গেয়ে ভাইরাল হওয়ার পরই আচমকা কাজ চলে গেল তাঁর! এমনটা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি শোভন। রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার অপরাধে কাজ গেল— এই আক্ষেপ নিয়েই এখন দিন কাটছে তাঁর।
শোভনবাবুর বয়স বছর ৪০। তাঁর বয়স যখন বছর দু’য়েক, বাবা ছেড়ে চলে যান। মায়ের সঙ্গে ওঠেন বেহালার সখেরবাজারে। মামাবাড়িতে। তারপর থেকে সেখানেই। ছোটোবেলা থেকে রবীন্দ্রনাথের গান ছিল তাঁর প্রিয়। গুনগুন করে সারাক্ষণ গাইতেন। ইচ্ছে ছিল শান্তিনিকেতন থেকে পড়াশোনা করার। তারপর বিশ্বভারতী থেকে মিউজিক নিয়ে স্নাতক হন। পরে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম মিউজিক করেন। কিন্তু চাকরি পাননি। রোজগারের জন্য সিকিউরিটি গার্ডের কাজ নেন। বেহালার একটি আবাসনে তিনি কর্মরত ছিলেন। তবে গান ছাড়েননি তিনি। কাজে কোনো গাফিলতি না করেই অবসর পেলে গুনগুন করে গাইতেন।
মাসখানেক আগে সিকিউরিটি গার্ডের পোশাক পরিহিত অবস্থায় তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসংগীতের ভিডিয়ো ভাইরাল হয়। অনেকে তাঁর কাছে গান শিখতে চেয়ে ফোনও করেন। তারপরই হঠাৎ বিপত্তি! যে সিকিউরিটি সংস্থায় কাজ করতেন, সেখান থেকে তাঁকে জানানো হয়, কাল থেকে আর আসতে হবে না! কারণ, তিনি নাকি অতিরিক্ত ঘামেন। গায়ে গন্ধ হয়! প্রায় একমাস তিনি ঘরবন্দি। মনখারাপ। রয়েছে আক্ষেপও। গান গাওয়ার অপরাধে শাস্তি? যদিও এ ব্যাপারে ওই সংস্থার এক আধিকারিক বলেন, ‘সঠিক কী হয়েছে জানি না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।’ এদিকে, তাঁর চাকরি যাওয়ার খবরও ভাইরাল হয়েছে। তার জেরে কয়েকদিন ধরে ওই সিকিউরিটি সংস্থা তাঁকে ফোন করে চলেছে, তিনি যাতে আবার কাজে ফেরেন। কিন্তু অভিমানী শোভন আর ফিরতে চান না। মন দিয়েছেন গানে। গুটিকয়েক ছাত্রছাত্রীও পেয়েছেন। শুরু করেছেন ক্লাস।
শোভনবাবু বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে চাকরি গেল! এখন ওরা আবার ডাকছে। আমি আর যাব না। খুব কষ্ট পেয়েছি। তবে প্রচুর মানুষ আমাকে ফোন করছেন। তাঁরা পাশে দাঁড়িয়েছেন। নতুন করে অনেক ছাত্র পেয়েছি। যাঁরা শিখতে আগ্রহী, তাঁদের নিয়ে বাড়িতে ক্লাস করাচ্ছি। অনলাইনেও পড়াচ্ছি। চাকরি গেলেও রবীন্দ্রনাথকে ছাড়তে পারব না। তাঁকে নিয়েই তো বেঁচে আছি।’