


হিমাংশু সিংহ: আসছে শীতে বিহার মোদিজির ওয়াটারলু হবে না ফুলে ফুলে ভরা বসন্ত? প্রশ্নটা কোটি টাকার, উত্তর নিয়ে জল্পনাও সেই কারণে ১৪ নভেম্বর ফল ঘোষণা পর্যন্ত চলতেই থাকবে! তবে অমিত শাহরা যে স্বস্তিতে নেই তা শুক্রবার প্রচারে বেরিয়ে তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। নীতীশই মুখ্যমন্ত্রী, জোর দিয়ে বলতে পারলেন না বিজেপির গত এক দশকেরও বেশি সময়ের সফল পোল স্ট্র্যাটেজিস্ট। তেমন কোনও ‘মুদ্দা’ না থাকায় বারবার লালুর আমলের জঙ্গলরাজ ফেরালে পরিস্থিতি ভয়ংকর হবে বলেই আবেদন করলেন ভোটারদের কাছে। আর সাহস জোগালেন চিরাগ, জিতনরাম ও উপেন্দ্র কুশওয়াদের হাতে থাকা অনগ্রসর শ্রেণির ভোটব্যাংককে। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট, মোদিজির রথের রশি এবার ওদেরই হাতে! এককথায় অনগ্রসর শ্রেণি। উন্নয়ন আর শিক্ষার নামে মিথ্যাচারের বেলুন ফাটিয়ে দিয়েছেন চোদ্দো সালে বিজেপি’র অন্যতম ভাড়া করা সেনাপতি প্রশান্ত কিশোর স্বয়ং। বিহারের শিক্ষিত তরুণ ও মহিলারা তাঁর কথায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। ডার্ক হর্স পিকেই এবার বিহার ভোটের ভাগ্যনিয়ন্তা! বিজেপি নিজেও জানে না তাদের শহুরে ভোটের কত শতাংশ কেটে নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে পিকে!
পিকে মহাশয় নিজেও কি জানেন তাঁর ভবিষ্যৎ? বোধহয় না। তবে এটুকু বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন, বিহারের রাজনীতিতে দ্রুত তৃতীয় বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে তাঁর জন সুরাজ পার্টি। মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়েও তাঁকে তেজস্বীর পিছনেই রাখছে সর্বভারতীয় সমীক্ষক সংস্থা। নীতীশের দল যদি ৪৩ আসন থেকে কমে ৩০-এর নীচে চলে যায়, সেক্ষেত্রে চাপে পড়ে যাবে বিজেপিও। প্রশান্ত কিশোরের বক্তব্য, এবার এসপার নয় উসপার! তাঁর দল জন সুরাজ পার্টি বিহারে হয় দেড়শোর বেশি আসন পাবে, নাহলে ১০টিরও কম আসনে থেমে যাবে। পোড়খাওয়া ভোট পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও নিজের সম্পর্কে তাঁর এমন অদ্ভুত মূল্যায়ন সত্যি অবাক করা! অবশ্য এর কোনও ব্যাখ্যা দেননি তিনি। তিনি আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, বিহারে এনডিএ এবার হারতে চলেছে। নীতীশ কুমারের দল পঁচিশের বেশি আসন কোনওভাবেই পাবে না। নীতীশের দল যদি পঁচিশে থেমে যায় তা বিজেপির পক্ষে বড় বিপর্যয় হিসেবেই গণ্য হবে। কারণ বিজেপিও একশোর অনেক নীচে থেমে যাবে। সেক্ষেত্রে চিরাগ পাসওয়ান, জিতনরাম মাঝি, উপেন্দ্র কুশওয়াদের সঙ্গে নিয়েও বিজেপির পক্ষে লালুপুত্রদের থামানো কঠিন। চিরাগ, উপেন্দ্র এবং জিতনরাম বাকি ৪১টি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ক’টা পেতে পারে? বিজেপির পক্ষে যা সবচেয়ে আতঙ্কের তা হচ্ছে, তরুণ ও মহিলারা ক্রমশ প্রশান্ত কিশোরের দিকে ঝুঁকছে।
পাটনার গত কুড়ি বছরের কিস্স্যা বলছে হাং হলেই নীতীশের পোয়াবারো! কাল যে শত্রু আজ সে-ই বন্ধু নিঃশব্দে। কিন্তু গরিষ্ঠতা না পেয়েও মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি দখলের খোয়াব বারবার সত্যি হয় না। গতবার ৪৩ আসনে জিতেও পাঁচ বছরের রাজ্যপাট সামলেছেন। লালু-বিজেপি দু’নৌকাই পর্যায়ক্রমে সঙ্গ দিয়েছে তাঁকে। একবার নয় চার-চারবার গরিষ্ঠতা না পেয়েও অবলীলায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিঃসন্দেহে রেকর্ড। এবারও সহজে দান ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন তিনি। কারণ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া তাঁর জলভাত! আশঙ্কা একটাই, বিজেপির সঙ্গে জেদাজেদি করে ১০১টি আসন আদায় করে প্রার্থী দিলেও ভোটের ফলে বিশেষ সুবিধা হবে না নীতীশের। এমনটাই ইঙ্গিত। নীতীশ ক্ষমতাচ্যুত হলে তা শুধু বিহারের পালাবদল হিসেবেই চিহ্নিত হবে না, লালুপুত্র তেজস্বীর উত্থান জাতীয় রাজনীতিতে ইন্ডিয়া জোটের হাতকেও শক্ত করবে। মুহূর্তে বদলে যাবে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণও যা এই মুহূর্তে জটিল বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে। ভোটকুশলী পিকে-র কথায়, ‘বল এখন বিহারবাসীর আদালতে।’ তাঁর জন সুরাজ পার্টি জাতপাতের রাজনীতিতে ক্লান্ত বিহারে নতুন আলোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সেই স্বপ্ন ফেরি করা থেকেই তিনি বলেছেন, ১১ বছর আগে তিনি যখন নরেন্দ্র মোদির ভাষণ লিখতেন তখন মোতিহারিতে উন্নয়ন ও নতুন কলকারখানা নির্মাণের কথা লিখেছিলেন। ভারতীয় রাজনীতির মোড় ঘোরানো সেই ভোটে মোদিজির প্রতিশ্রুতি ছিল বিহার আর পরিযায়ী শ্রমিক তৈরির কারখানা হয়ে থাকবে না। গুজরাত, মুম্বই, বাংলায় পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে গিয়ে জীবনধারণ বিহারের তরুণদের একমাত্র ভবিষ্যৎ হতে পারে না। কিন্তু তারপর এক দশক পেরিয়েও সেই প্রতিশ্রুতি হাওয়াতেই ভেসে বেড়াচ্ছে। কেউ কথা রাখেনি। রাজনীতিকরা শুধু ভোট এলে প্রতিশ্রতির ইন্দ্রজাল বোনে সযত্নে। তারপর? ২ কোটি চাকরি, ১৫ লক্ষ টাকা অ্যাকাউন্টে, কৃষকের দ্বিগুণ আয়, সব কথার কথা হয়েই থেকে যায় পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত!
এবারের বিহার নির্বাচন বহু অর্থেই তাৎপর্যপূর্ণ। আবার বলছি, গতবার কোভিডের পরপরই যে নির্বাচন হয়েছিল তার দিকে তাকালেই স্পষ্ট, সরকার গড়ার জনাদেশ নীতীশ কুমারের পক্ষে ছিল না। সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছিলেন লালুপুত্র তেজস্বী, ৭৫টি। একটা আসন দূরে দাঁড়িয়েছিল বিজেপি। তবু সবাইকে বোকা বানিয়ে ২৪৩ সদস্যের বিধানসভায় মাত্র ৪৩ জন এমএলএ নিয়ে নেপোয় মারে দই! পাঁচ বছর কখনও বিজেপি আবার কখনও লালুপুত্রের ঘাড়ে চেপে রাজ্য শাসন করে গিয়েছেন কুড়মি সম্রাট। গত কুড়ি বছরের যাত্রায় ২০০৫ সালে জিতেছিলেন ৮৮টি, একক গরিষ্ঠতা থেকে ৩৪ আসন কম। তারপর দু’বার মাত্র ১১৫ এবং ৭১টি। সরকার গড়ার ম্যাজিক ফিগার, ১২২ এর বেশ পিছনে! তাতে কী, ‘যো সিএম বনা ওহি সিকান্দার!’ এবার কিন্তু লড়াইটা অত্যন্ত জটিল। একদিকে তেজস্বী যাদবদের সম্মিলিত মুসলিম-যাদব ভোটব্যাঙ্ক। উল্টোদিকে নীতীশের কুড়মি, কোয়েরি, নন যাদব ওবিসি এবং প্রান্তিক পিছড়ে বর্গ। বিহারে এই মুহূর্তে মুসলিম ভোটার প্রায় আড়াই কোটি। শতাংশের হিসেবে ভোটারদের ১৮ শতাংশ। আর যাদব ১৪ শতাংশ। ওবিসি ও প্রান্তিক ওবিসি মিলিয়ে ৬৩ শতাংশ। নীতীশের তালিকায় মাত্র চারজন মুসলিম। গতবার ছিল দশজন। এই সংখ্যাটাই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে রাজনৈতিক মহলে। অন্যদিকে, বিজেপি-র ২০২৫ সালের প্রার্থী তালিকায় একজনও মুসলিম নাম নেই। চৈনপুর, আমউর, জোকিহাট এবং আরারিয়া আসন থেকে সংখ্যালঘু প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে জেডিইউ। চৈনপুর থেকে লড়ছেন জেডিইউর জামা খান। আমউর থেকে লড়বেন সাবা জাফর, জোকিহাট থেকে মঞ্জর আলম এবং আরারিয়া থেকে লড়ছেন শাগুপ্তা আজিম। চৈনপুর বাদে বাকি তিনটি আসন রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সীমাঞ্চল এলাকায় অবস্থিত। রাজ্যের ১৮ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার একটি বড় অংশের বাস এই সীমাঞ্চলেই। ২০২০ সালের নির্বাচনে চৈনপুর দখল করে বহুজন সমাজ পার্টি। কংগ্রেসের দখলে ছিল আরারিয়া। ওয়াইসির মিম জেতে আমউর এবং জোকিহাট আসন। এবার অবশ্য আসাউদ্দিন ওয়াইসি আরও বেশি আসনে লড়ছেন মুসলিম ভোট কাটতে। ফল কী হয়, সেটাও দেখার বিষয়। যাদবরাও তেজস্বীকে একতরফা আশীর্বাদ করে কি না, তা বড় প্রশ্ন।
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর এবার বিহার ভোটে তুরুপের তাস। এসআইআর। প্রথমবার ভোট দেবেন ১৪ লক্ষ। মোট মহিলার সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি এবং যুব সম্প্রদায় দেড় কোটি। মুসলিম প্রায় আড়াই কোটি। এবার দুই প্রধান শক্তি বিজেপি ও তেজস্বীর বাড়া ভাতে ছাই দিতে উদ্যত প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ দল এবং আসাউদ্দিন ওয়াইসি। যদি তাঁরা মুসলিম ভোটে ভাঙন ধরাতে সক্ষম হন, সেক্ষেত্রে অমিত শাহদের পোয়াবারো হবে। এবং প্রমাণিত হবে বিজেপির গোপন অঙ্গুলিহেলনেই পিকে এমন ভীমরবে বিহারের নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। শুধু পিকে কিংবা ওয়াইসিই নয় আদিবাসী ভোট কাটতে আসরে আছেন দুই হেভিওয়েট উপেন্দ্র কুশওয়া এবং জিতন রাম মাঝি। এরা সবাই যদি জটিল ভোট কাটাকুটির খেলায় সফল হয় সেক্ষেত্রে বিহারে ‘হাং’ বিধানসভা অবশ্যম্ভাবী। তখন আবার নেপোয় দই মারার মতো গদি দখলের লড়াইয়ে সামনের সারিতে অবতীর্ণ হতে পারেন নীতীশ কুমার। প্রশ্ন একটাই আসাউদ্দিন এবার বেশি আসনে প্রার্থী দিয়ে ইন্ডিয়া জোটকে যে উচিত শিক্ষা দিতে চাইছেন সেটা ভোটাররা কতটা গ্রহণ করবেন। ওয়াইসির অবস্থা যদি আমাদের নৌশাদ সিদ্দিকির দলের মতো হয় তাহলে বলব, এবার বিহারে পালাবদলের সম্ভাবনা প্রবল। এতদিন মানুষ বলত বিকল্প নেই, এখন তো আছে। যদি এখনও ভুল করেন, তাহলে পরিবর্তন হবে না। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব, সব একই থাকবে। বিহারের ছেলেমেয়েরা অন্য রাজ্যে গায়ে-গতরে খেটে কাজ করে জীবনধারণ করতে বাধ্য হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বিলক্ষণ জানেন, তিনি নরেন্দ্র মোদির কেরিয়ার শেষ করার কেউ নন। বিশ্বব্যাপী শুল্কযুদ্ধে নয়াদিল্লিকে লাইনে আনতে এসব স্রেফ ধমকানি চমকানি মাত্র। ওটা করতে পারে একমাত্র ভারতের জনগণ। পবিত্র নির্বাচনে ভোটযন্ত্রে বিপ্লবের মাধ্যমে। আসন্ন বিহার ও তৎপরবর্তী পাঁচ রাজ্যের মিনি লোকসভা নির্বাচনের ফলের ধাক্কায় যদি কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের বিপর্যয় নেমে আসে তবে রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি হবেন মোদিজি। ৫৬ ইঞ্চি ছাতি, বিশ্বগুরু, অপারেশন সিন্দুরের নায়ক, শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রীর তকমাগুলো নিমেষে মিলিয়ে যাবে হাওয়ায়। যেমন রাজনীতির বহতা নদীতে অনেক কিছুই বয়ে যায়, ফিরে আসে কম! কে না জানে একনায়কদের শত্রু বড় কম হয় না ভিতরে ও বাইরে। দলে ও সরকারে। জটিল জাতপাতের অঙ্কে আগামী মাসে বিহারের মানুষ যদি তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন তাহলে মোদি- অমিত শাহের কেরিয়ারে যে বড় অন্ধকার নেমে আসবে তা নিশ্চিত। যার প্রভাবে প্রায় পিঠোপিঠি বাংলা, তামিলনাড়ু, কেরলের ভোটেও গেরুয়া শিবিরের রাজনৈতিক লড়াই দেওয়া কঠিন হবে। শুধু সান্ত্বনা পুরস্কার অসম নিয়ে খুশি থাকতে হবে সেক্ষেত্রে। সেই অর্থে এসআইআর পরবর্তী বিহারের ভোট নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিজেপি’র সামনেও বড় চ্যালেঞ্জ। ৬৮ লাখ লোক বাদ, বাইশ লাখের অন্তর্ভুক্তি সবমিলিয়ে ৪৭ লাখ ভোটার কমে লাভ কার হল জানতে মুখিয়ে আছে বাংলার মানুষও। আসন্ন ১৪ নভেম্বরের পরিণামে যদি এসআইআরের পরও বিহারে বিজেপি’র ভরাডুবি হয়, নীতীশ কুমার নিশ্চিহ্ন হন, তাহলে বাংলা সহ বাকি দেশে ওই প্রক্রিয়া চালানো হবে কি না তাও বড় গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যাবে। নভেম্বরে বাংলার রাজনীতি উত্তাল হতে চলেছে এসআইআর প্রশ্নে। বিহারে হারলে এসআইআর নিয়ে আর এগোনোর সাহস পাবে না কেন্দ্রের সরকার ও তার বশংবদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার।