Bartaman Logo
১৮ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ‘সাগর কুটির’ অবহেলিত, আশাহত বাসিন্দারা  

স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ‘সাগর কুটির’ অবহেলিত, আশাহত বাসিন্দারা
 
  • ২৫ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
সংবাদদাতা আরামবাগ: আজও অবহেলিত বিপ্লবী প্রফুল্লচন্দ্র সেনের স্মৃতি বিজড়িত সাগর কুটির। বার বার হেরিটেজ ঘোষণার দাবি উঠলেও তা মান্যতা পায়নি। তাই পঞ্চায়েতের তরফে ছোট ছোট স্কিম করে সাগর কুটির সাজানো হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। সাগর কুটির বাড়িটি এখনও পুরোপুরিভাবে মেরামত হয়ে ওঠেনি। এতে আশাহত গ্রামের বাসিন্দারা। তাঁরা বলেন, স্বাধীনতার আন্দোলনে আমাদের গ্রামের অবদান থাকলেও সাগর কুটির সেই গুরুত্ব পায়নি সরকারের থেকে। আমরা চাই এই সাগর কুটিরকে হেরিটেজ তকমা দিয়ে সংগ্রহশালায় পরিণত করা হোক।
Advertisement
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯২১ সালে বন্যাত্রাণের কাজে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রফুল্লচন্দ্র সেন জায়গাটি নির্বাচন করেন। সাগর কুটিরকে কেন্দ্র করে আরামবাগে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রফুল্লচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে আরামবাগের নারী ও পুরুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আন্দোলনে পুরুষদের নাম পাওয়া গেলেও উপেক্ষিত থেকে গিয়েছে মহিলাদের নাম। যদিও এলাকার মানুষ তাঁদের মনে রেখেছেন। প্রফুল্লচন্দ্র সেন, মৃগেনবালা রায়, সুশীলাবালা দাসীকে গ্রামের মহিলাদের আন্দোলনে যুক্ত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে গ্রামের মহিলারা দেশের জন্য লড়াই শুরু করেছিল। গ্রামের মানুষের মুখে মুখে আজও ফেরে বরদামণি হাইত (হাবুর মা), মৃগেনবালা দেবী (কেষ্টর মা), তীর্থনাথ ঘোষের মা, মাখনলাল হাজরার স্ত্রী, লক্ষ্মী জানার মায়েদের নাম। যাঁরা গোয়ালিনি ও মেছুনির ছদ্মবেশে কুটিরে খাবার পৌঁছে দিতেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে বিপ্লবীদের সেবা শুশ্রূষা করতেন।
১৯৩১ সালে জেলার আইন অমান্য আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল সাগর কুটির। যে আন্দোলনে হেমালিনী দেবী, এককড়িবালা ঘোষের মতো মহিলারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সরকার আরামবাগের আইন অমান্য কমিটিকে বেআইনি ঘোষণা করে। পরের দিন সাগর কুটির দখল করে ব্রিটিশ পুলিস। কুটির ফেরাতে এলাকায় শুরু হয় আন্দোলন। গ্রামের মহিলারা কুটির দখল করতে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিসের লাঠির ঘায়ে আহত হন। প্রফুল্ল ঘোষ, বিজয় মোদক, হেমন্ত বসু, অতুল্য ঘোষ, প্রাণকৃষ্ণ মিত্র, ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের মতো বিপ্লবীরা এই কুটিরে যখন এসেছেন তখন গ্রামের মহিলারা গোপনে তাঁদের কাছে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। পুলিস ছোট ছেলেদের ধরে বিপ্লবীদের নাম জানার চেষ্টা করলে সন্তানদের মুখ থেকে নাম বার হওয়ার চেয়ে তাদের জেলে যেতে অনুপ্রাণিত করতেন মহিলারা। স্থানীয় বাসিন্দা সঞ্জিত অধিকারী বলেন, আমার দাদু লক্ষ্মীনারায়ণ অধিকারী স্বাধীনতা আন্দোলনে জেল খেটেছেন। ওঁর মাসিমা সুশীলাবালা দেবী গ্রামের মহিলাদের স্বাধীনতা আন্দোলন অনুপ্রাণিত করেছিলেন। বিপ্লবীদের মাতৃস্নেহে বহুবার রক্ষা করেছেন।  প্রফুল্লচন্দ্র সেন তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর আগে স্থানীয় বড়ডোঙ্গল রমানাথ ইনস্টিটিউশনকে সাগর কুটির সংলগ্ন জায়গা দান করে যান। এলাকায় লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে যাতে এলাকার ছেলেমেয়েরা গিয়ে পড়াশোনা করতে পারেন। 
মহিলাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন চরকা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মধ্যেই তিনি এই এলাকার উন্নয়নের কাজেও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এহেন ইতিহাস সমৃদ্ধ সাগর কুটির অবহেলিত থেকে যাওয়ায় গ্রামের মানুষরা আশাহত। সেখানে গিয়ে দেখা গিয়েছে, সাগর কুটির বাড়িটি মেরামত করা হলেও তার দেয়ালে ফাটল। সেখানে নেই প্রফুল্লচন্দ্র সেন সহ বিপ্লবীদের স্মৃতিচিহ্ন। পঞ্চায়েতের তরফ থেকে বাগানটি সাজানো হলেও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে সম্পূর্ণ হয়নি। বাগানে অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে দোলনা। শালেপুর ২ গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান উত্তম বেড়া বলেন, আমরা পঞ্চায়েতের তরফ থেকে যতটা করার তা করছি। কিন্তু সাগর কুটিরকে ঢেলে সাজানোর জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। আমরা বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আমরাও চাই সাগর কুটির হেরিটেজ তকমা পাক।
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ