শ্রীকান্ত পড়্যা, ময়না: বাবা পেশায় রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে। দৈনিক মজুরি ৩৫০ টাকা। মা গৃহবধূ। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার। ময়না থানার মথুরাপুর গ্রামের সায়ন বেজ সেই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা উপক্ষো করে এবার মাধ্যমিকে দশম স্থান লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় বাড়ি পেলেও দরজা, জানালা এখনও ঠিকমতো বসানো হয়। পলিথিন দিয়ে সেসব ঢাকা। বাড়িটার উপরেও চাপানো ত্রিপল। বাস্তবের জীবন সংগ্রাম কঠিন হলেও ওই কৃতী ছাত্রের দু’চোখজুড়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। ভবিষ্যতে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে রোগীর সেবা করাই তাঁর লক্ষ্য। সেই স্বপ্নকে মনের মধ্যে লালন পালন করে মাধ্যমিকে নজরকাড়া সাফল্য পেয়েছে সায়ন।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নামকরা স্কুলগুলির মধ্যে অন্যতম ময়না থানার বলাইপণ্ডায় অবিস্থত পরমানন্দপুর জগন্নাথ ইন্সটিটিউশন। ২০২২সালে মাধ্যমিকে নবম স্থান দখল করেছিল এখানকার ছাত্র। ২০২৩সালে উচ্চ মাধ্যমিকে এখানকার পড়ুয়া ষষ্ঠ স্থান দখল করে। ২০২৪সালে দুই নম্বরের জন্য মাধ্যমিকে মেধা তালিকায় হাতছাড়া হয়। এবার সায়ন ৬৮৬নম্বর পেয়ে দশম স্থান দখল করল। তার পরিবারিক অবস্থার কথা স্কুলের প্রত্যেক শিক্ষক জানতেন। স্কুলের শিক্ষকরা কোনও ফি ছাড়াই তাকে বিশেষ গাইড দিতেন। এছাড়া দু’জায়গায় সে ব্যাচে পড়তে যেত।
সায়নের এই সাফল্যে খুশি গোটা ময়নাবাসী। একইসঙ্গে আনন্দিত তার পরিবার ও স্কুল। স্কুলে বরাবর প্রথম হতো সায়ন। নবম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণিতে ওঠার সময় সে দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়। তখন থেকে আরও ভালো প্রস্তুতির জন্য জেদ চেপে বসেছিল। টেস্ট পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পায় সায়ন। তাকে ঘিরে শিক্ষকদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ওই স্কুল থেকে মোট ২০৯জন এবার মাধ্যমিক দিয়েছিল। কিন্তু, সায়ন একটা চমক দিতে পারে বলে শিক্ষকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছিল। স্যারেদের প্রত্যাশা পূরণ করেছে ওই কৃতী ছাত্র। রাজ্য মেধা তালিকায় ৬৬জনের মধ্যে সেও স্থান করে নিয়েছে। স্কুলের নাম উজ্জ্বল করেছে। সেইসঙ্গে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নামও উজ্জ্বল করেছে। এদিন প্রধান শিক্ষক রঞ্জিতকুমার সামন্ত তাকে জড়িয়ে স্নেহে ভরিয়ে দেন। ওই কৃতী ছাত্র বলে, বাবা রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করেন। দৈনিক ৩৫০ টাকা মজুরি। চাষের জমি সেভাবে নেই। কষ্টের মধ্যেই সংসার চলে। পড়াশোনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই। পরিবার পরিজনদের মুখে হাসি ফোটানোই আমার অঙ্গীকার। স্কুলের শিক্ষকরা আমার আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে সকলেই অবগত। তাই তাঁদের অনেকে বিশেষ করে গাইড করেছেন। আমি তাঁদের প্রত্যেককে কৃতজ্ঞতা জানাই। পরমানন্দপুর জগন্নাথ ইন্সটিটিউশনের প্রধান শিক্ষক বলেন, সায়ন আমাদের স্কুলের অহংকার। অভাব অনটন পড়াশোনায় কোনও ছাপ ফেলতে পারে না। মাধ্যমিক পরীক্ষা ফলাফলে আমাদের স্কুলের ছাত্র সায়ন সেটা প্রমাণ করে দিয়েছে। বাবা একজন রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরনোর অবস্থা। অথচ, সেসব তার মধ্যে কোনও প্রভাব ফেলেনি। নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে গোটা রাজ্যে সেরা ৬৬জনের মধ্যে জায়গা নিশ্চিত করেছে সায়ন। স্কুল তার পাশে ছিল। আগামী দিনেও থাকবে। সায়নের বাবা শম্ভুনাথ বেজ বলেন, ছেলের সাফল্যের খবর জানাজানি হতেই অনেকে এসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। ছেলে ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চায়। ছেলের স্বপ্ন পূরণ করতে এবার থেকে প্রয়োজনে ওভারটাইম কাজ করব। সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।