নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: সুবর্ণরেখা রেখা নদী থেকে দেদার বালি তোলা হচ্ছে। নদীগর্ভের গভীরতা বাড়ছে। পার্শ্ববর্তী ভূগর্ভস্থ জলস্তরের সঙ্গে যোগ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আরটিজিও কূপের জল শুকিয়ে যাচ্ছে। নদীর বাস্তুতন্ত্র বদলে ভূবিজ্ঞানিরা নদী উপত্যকাজুড়ে ভূমিধ্বসের আশঙ্কা করছেন।
সুবর্ণরেখা নদীর গতিপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৯৫ কিমি। ঝাড়গ্ৰামের গোপীবল্লভপুর-১ ও ২ ও নয়াগ্ৰামের উপর দিয়ে নদীটি বয়েছে। নদীতে সারাবছর জল থাকে। জেলার দক্ষিণ অংশে সেচের জলের প্রধান উৎস এই নদী। নদীগর্ভ থেকে দেদার বালি তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নদীর বুকে জমে থাকা পুরনো বালিস্তরও এখন বাদ যাচ্ছে না। যার জেরে নদীগর্ভের গভীরতা বেড়ে যাচ্ছে। নদীর জল নিচু দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় পার্শ্ববর্তী ভূগর্ভস্থ জলস্তরের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যার জেরে নদীর সংলগ্ন একাধিক আরটিজিও কূপের জল শুকিয়ে যাচ্ছে। চাষের কাজে ব্যাবহৃত ভৌমজল পাওয়া যাচ্ছে না। সাবমার্সিবল বসানো হলেও ব্লকের বহু জায়গায় জল মিলছে না। সাধারণ চাষিরা চাষের কাছে চড়াদামে জল কিনছেন। নদীতীরবর্তী ভূমির বাস্তুতন্ত্রের বদলে ভূমিধ্বসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেতু, চেকড্যাম, বাড়ি নির্মাণে যার প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। গোপীবল্লভপুর ও তার পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় সাবমার্সিবল ও টিউবওয়েলের জল পেতে গেলে এখন ৫০ থেকে ৬০ ফুট নিচে পাইপ বসাতে হচ্ছে। দু’দশক আগে ২০ থেকে ৩০ ফুট নীচে জল পাওয়া যেত। হাতে খোঁড়া আরটিজিও কূপ থেকে সহজেই জল পাওয়া যেত। ব্লকের সারিয়া গ্ৰাম পঞ্চায়েত এলাকার চাষি সত্যেন খামরুই বলেন, এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলস্ত অনেক নীচে নেমে গিয়েছে। একসময় আরটিজিও কূপের জল এই এলাকার মানুষের প্রধান ভরসা ছিল। কূপের জলে চাষবাস হত। জমিতে চড়তে আসা গবাদিপশুরা কূপের জল খেত। কূপ থেকে এখন আর জল পাওয়া যায় না। গোপীবল্লভপুর -১ ব্লকের কেন্দুগারি গ্ৰাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান গৌতম কাপাট বলেন, এই এলাকায় সেচের জলের তীব্র সমস্যা দেখা দিয়েছে। গরমে টিউবওয়েল ও সাবমার্সিবল থেকেও পর্যাপ্ত জল উঠেছে না। বৃষ্টির জল ধরে রাখা গেলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বাড়বে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা এখানে গড়ে তোলা যায়নি।
দহিজুড়ি মহাত্মা বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক মৃন্ময় হোতা বলেন, সুবর্ণরেখা নদীর যে স্তরে আগে জল প্রভাবিত হতো তা থেকে এখন নীচে বইছে। নদী তীরবর্তী ভূগর্ভস্থ জলস্তরের সঙ্গে যোগ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সেই কারণে আরটিজিও কূপগুলি অকেজো হয়ে যাচ্ছে। নদী উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকার ভূগর্ভস্থ জলস্তরে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জল সঞ্চিত হওয়ার চক্রাকার পদ্ধতি ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি না বদলালে সামনের দিনে এই এলাকায় তীব্র জলের সঙ্কট দেখা দেবে। জামবনী সেবা ভারতী মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ভূবিজ্ঞানী প্রণব সাউ বলেন, সুবর্ণরেখা নদীর কুঠিঘাট থেকে কোদপাল পর্যন্ত জল প্রবাহ নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়। দেখা যায়,বালি উত্তোলনের জেরে নদী গর্ভের ১২ থেকে ১৬ ফুট পর্যন্ত স্তর ক্ষতিগ্ৰস্ত হয়েছে। এখানে জল সঞ্চিত থাকে। এই স্তরের বালি তুলে ফেলায় পার্শ্ববর্তী ভূগর্ভস্থ জলস্তরের সংযোগ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত বালি তোলায় নদীর বুকে নতুন করে বালি সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়ছেনা। যা নদীর দীর্ঘদিনের ভূমিগত বাস্তুতন্ত্রের চেহারা বদলে দিচ্ছে। ভূমিধ্বসের সম্ভবনা দেখা দিচ্ছে। বিষয়টি যথেষ্ট উদ্বেগজনক।