সংবাদদাতা, রামপুরহাট: কৌশিকী অমাবস্যার রাতে রামপুরহাট স্টেশন চত্বরে বৃদ্ধ সাধুকে নৃশংস খুন ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ডের ৫৪দিন পর মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করল রামপুরহাট থানার পুলিশ। সাধুর রক্ত দিয়ে তন্ত্রসাধনা করে অলৌকিক শক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল বলে প্রাথমিক জেরায় জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। মঙ্গলবার রাতে তারাপীঠ এলাকা থেকে অভিযুক্ত বছর ৩৫-এর যুবক রীতেশ প্রকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধৃতের বাড়ি বিহারের পাটনার কঙ্করবাগ থানার মালাহিপাকরি এলাকায়। বুধবার তাকে রামপুরহাট মহকুমা আদালতে তোলা হয়। সরকারি আইনজীবী সৈকত হাটি বলেন, বিচারক ধৃতকে ১০দিন পুলিশি হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ১০সেপ্টেম্বর কৌশিকী অমাবস্যার রাতে রামপুরহাট স্টেশন চত্বরের সাইকেল স্ট্যান্ডের পিছন থেকে উত্তর ২৪ পরগনার গোপালপুরের বাসিন্দা মনোরঞ্জন স্যান্ডেল(৬৭) নামে ওই সাধুর ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। তিনি ফল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নিয়মিত পুজোআচ্চা ও সাধনায় যুক্ত ছিলেন। ঘটনার তদন্তের দাবিতে সরব হয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দল। সোচ্চার হয় কংগ্রেসও। পরবর্তীকালে ১৩সেপ্টেম্বর রামপুরহাটের ১৫নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সমীর সিং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি জানান, এক অজ্ঞাতপরিচয় যুবক স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে একের পর এক আঘাত করে ওই সাধুকে খুন করেছে। রামপুরহাট মেডিকেলের মর্গে এসে দেহ শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান ধরে তদন্তে নামে পুলিশ। তবে ঘটনাস্থলে কোনো সিসি ক্যামেরা না থাকায় প্রাথমিক সমস্যা তৈরি হয়। এরপর স্টেশনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে পুলিশ। দেখা যায়, টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধুর সঙ্গে ভাব জমিয়ে এক যুবক তাঁর ঘাড়ে হাত দিয়ে সাইকেল স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছে। আর একটি ফুটেজে দেখা যায়, ওই যুবক একটি টোটোয় চেপে তারাপীঠের দিকে যাচ্ছে। এরপর পুলিশ একটি তিনতলা ভাড়াবাড়ির সন্ধান পায়। বাড়িমালিকের কাছ থেকে অভিযুক্তের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে বিহারে তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এরইমধ্যে পুলিশের হাতে একটি ভিডিও আসে। তাতে দেখা যায়, ওই যুবক সাধুকে স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে একের পর এক কোপ বসাচ্ছে। তা দেখছেন কয়েকজন। সাধু আর্তনাদ করলেও কেউ এগিয়ে আসেননি। পুলিশ সূত্রের খবর, বিহারের অত্যন্ত বিত্তশালী পরিবারের সন্তান ধৃত রীতেশ অবিবাহিত। পরিবারের একাধিক ব্যবসা ও কারখানা রয়েছে। পুলিশ জানতে পারে, লকডাউনের পর সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য সে বাড়ি ছাড়ে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত না। গত ১ জুন থেকে তারাপীঠে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে সে শ্মশান ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাতায়াত শুরু করে। খুনের পরই সে ভাড়াবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। মঙ্গলবার রাতে ফের তারাপীঠে আসতেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানিয়েছে, জেরায় ধৃত স্বীকার করেছে যে তন্ত্রসাধনা করে শক্তি সঞ্চয়ের জন্যই কৌশিকী অমাবস্যায় একাকী থাকা কোনো সাধুকে খুঁজছিল সে। মনোরঞ্জনবাবুকে একা পেয়ে কৌশলে ডেকে এনে খুন করে। তারপর পালিয়ে গিয়ে কামাখ্যা সহ বিভিন্ন তীর্থস্থানে ঘুরে কালীপুজোর অমাবস্যায় তন্ত্রসাধনার উদ্দেশ্যে তারাপীঠে ফিরে এসেছে সে। ধৃতের ব্যাগ থেকে লাল ধুতি, পাঞ্জাবি, ছোট ত্রিশূল ও একাধিক রুদ্রাক্ষের মালা উদ্ধার করা হয়েছে। খুনে ব্যবহৃত স্ক্রু-ড্রাইভারটি উদ্ধারের পাশাপাশি কালীপুজোর অমাবস্যায় ফের কোনও হত্যার ছক ছিল কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।



