Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

উদিত সূর্য

ভাবা অ্যাটমিক সেন্টারের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অশোককুমার যাদব। কিছুদিন হল বারাণসী থেকে বদলি হয়ে মুম্বইয়ে এসেছেন। তাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে তাঁর ক্রিকেটপাগল ছেলে।

উদিত সূর্য
  • ১২ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০

ভাবা অ্যাটমিক সেন্টারের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অশোককুমার যাদব। কিছুদিন হল বারাণসী থেকে বদলি হয়ে মুম্বইয়ে এসেছেন। তাতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে তাঁর ক্রিকেটপাগল ছেলে। ছোট্ট সূর্যের কাছে মুম্বই ছিল নতুন সুযোগ, নতুন পথ। যেন হঠাত্ তিনি পেয়ে গেলেন প্রাণবন্ত এক শহর, যেখানে ক্রিকেট শুধু খেলা নয়, এক স্বপ্নের নাম। মুম্বইয়ের ছোট্ট গলিপথগুলিতে সারাক্ষণই ক্রিকেটে মেতে থাকতে শুরু করলেন ছোট্ট সূর্য। আর তা নজর এড়ায়নি বাবা অশোক যাদবের। একদিন অফিস বেরনোর সময় কোয়ার্টারের মাঠে সূর্যের ব্যাটিং দেখার জন্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। তারপর যা ঘটল, তাতে তাঁর চোখে ভাসল স্বপ্নের ভেলা। বল যেখানেই পড়ুক তা অবলীলায় মাঠের বিভিন্ন কোণে ছক্কা হাঁকাচ্ছেন তাঁর ছেলে। এবি ডিভিলিয়ার্সের মতো ‘৩৬০ ডিগ্রি’ ব্যাটিং। বলাই বাহুল্য, মিস্টার ৩৬০ ডিগ্রির প্রথম ঝলক নজরে এসেছিল বাবারই। ব্যস, কালবিলম্ব না করে পরের দিনই ছেলেকে স্থানীয় ক্রিকেট কোচিংয়ে ভর্তি করলেন অশোক যাদব। সেই সঙ্গে সূচনা হল সূর্যকুমার যাদবের জীবনের নতুন অধ্যায়। তখন নিশ্চয়ই তাঁর বাবা ভাবেননি, তাঁর ছেলে একদিন জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেবেন!

Advertisement

ছোটবেলা থেকেই  সূর্যকুমারের ব্যাটিং বাকিদের থেকে আলাদা। সেটা কোচেদের নজরে পড়তেও বিলম্ব হয়নি। খুব দ্রুতই মুম্বইয়ের বয়সভিত্তিক দলে জায়গা করে নেয় ছেলেটি। আর ২০১০ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নাম লেখান সূর্যকুমার। সুযোগের সদ্ব্যবহারেও ভুল হয়নি তাঁর। ২০১১-’১২ মরশুমে ঘরোয়া ক্রিকেটে দুরন্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে আইপিএলের দরজাও খুলে যায়। ২০১২ সালে তিনি নাম লেখান মুম্বই ইন্ডিয়ান্সে। তবে ক্রোড়পতি লিগে শুরুর দিকে সেভাবে নজর কাড়তে পারেননি তিনি। পরের বছর তাঁর ঠিকানা হয় কলকাতা নাইট রাইডার্সে। সূর্যের প্রতিভা নিয়ে কখনওই সংশয়ের অবকাশ ছিল না। কিন্তু অজ্ঞাত কোনও কারণে তাঁর কেরিয়ার গতি পাচ্ছিল না। তবে আইপিএলের মঞ্চেই সূর্যকুমার যাদবের আসল উড়ান শুরু হয় ২০১৪ সালে। সেবার শাহরুখ খানের ফ্র্যাঞ্চাইজিকে খেতাব জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন সূর্যকুমার। ভালোবেসে ক্যাপ্টেন গৌতম গম্ভীর তাঁর নাম রেখেছিলেন ‘স্কাই’। রীতিমতো আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। ম্যাচ জেতানো ঝোড়ো ইনিংসগুলি তাঁকে নির্ভরতার প্রতিমূর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। ২০১৮ সালে তাঁকে ঘরে ফেরায় মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। সেই মরশুমে ৫১২ রান করে তাক লাগিয়ে দেন সূর্যকুমার। সেখান থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি স্কাইকে। মাঠের চারদিকে শট খেলার স্কিলের জন্য ‘মিস্টার ৩৬০ ডিগ্রি’ হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকেন। কিন্তু স্বপ্নপূরণের এই পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। শুরুর দিকে অজ্ঞাত কোনও কারণে তাঁর কেরিয়ার গতি পায়নি। পারফরম্যান্সেও উত্থান-পতন এসেছে। কখনও বা পিছু নিয়েছে চরম দুর্ভাগ্য। সূর্যের কথায়, ‘জীবনে চড়াই উতরাই তো ছিলই। তবে কখনও নিজের শক্তির উপর বিশ্বাস হারাইনি। জানতাম, একদিন ঠিক নিজের লক্ষ্যে পৌঁছব।’ অবশেষে ২০২১ সালে স্বপ্নপূরণ হয় সূর্যকুমার যাদবের। টি-২০-তে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দেশের জার্সিতে অভিষেক হয় স্কাইয়ের। আর আন্তর্জাতিক অভিষেকে প্রথম ডেলিভারিতেই জোফ্রা আর্চারের বল ছক্কা উড়িয়ে সবাইকে চমকে দেন। সেখানেই শেষ নয়। ক্রমে ক্রমে তিনি হয়ে উঠেন টি-২০-তে দলের নির্ভরযোগ্য ব্যাটার। এই ফরম্যাটে দ্রুততম এক হাজার রানের রেকর্ডও নিজের নামে করেন। আইসিসি টি-২০-তে বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কারও পান তিনি। ২০২৪ সালে ভারতকে টি-২০ বিশ্বকাপ জেতানোর অন্যতম কাণ্ডারীও সূর্যকুমার যাদব। সেখানেই শেষ নয়। রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলিদের অবসরের পর টি-২০ ক্রিকেটে ভারতের নেতৃত্বভারও উঠে সূর্যকুমার যাদবের কাঁধে। আর সফলভাবে সেই দায়িত্ব পালন করছেন স্কাই। তাঁর নেতৃত্বে সম্প্রতি পাকিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপের খেতাবও জিতেছে টিম ইন্ডিয়া। সাফল্যের দীর্ঘ পথে সংগ্রাম, হার না মানা মনোভাব তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা এবি ডিভিলিয়ার্সের পর ‘মিস্টার ৩৬০ ডিগ্রি’ উপাধির যোগ্যতম ধারক।  
সূর্যকুমার যাদব জানেন, ব্যাটিংয়ে নিয়ম ভাঙাও এক ধরনের কৌশল। এবি ডিভিলিয়ার্সের উত্তরসূরি হিসেবে নয়, বরং এক সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানার খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর বিধ্বংসী ইনিংস শুধু ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে না, ক্রিকেটের সৌন্দর্যও বাড়ায়।

সম্পর্কিত সংবাদ