সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: ‘বন্দেমাতরম, জয় জয় ভারতবর্ষম’, কোনও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্লোগান নয়! কালীমন্দিরের মন্ত্র এটি। দেশাত্মবোধের এই মন্ত্রেই পূজিত হয়ে আসছেন মা কালী। তাঁকে স্মরণ করেই দেশের বিপ্লবীরা বহু মহান কাজ করেছেন। তাই এই ডাকেই মা সন্তুষ্ট হন। এখানে মা কালী ভারতমাতা রূপে পূজিত। মন্দিরে আত্মগোপন করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো মহান বিপ্লবীও। একসময়ের জঙ্গলে ঘেরা প্রত্যন্ত এলাকায় থাকা কালীমন্দির আজ বহুতল অট্টালিকার মাঝে অবস্থিত। স্টিল সিটি দুর্গাপুরের প্রাণকেন্দ্র সিটি সেন্টার এর অদূরে অম্বুজায় রয়েছে মা ভবানী পাঠকের কালীমন্দির। যে মন্দিরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা কাহিনি। বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানীর স্মৃতি।
সেন বংশের রাজত্বকালে এই এলাকা গোপভূম নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করেছিলেন ইছাই ঘোষ। তাঁর হাত ধরেই গভীর জঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত হয় এই কালী মন্দির। মন্দিরের ব্যয়ভার কীভাবে চলবে? তারজন্য তিনি মন্দিরের পিছনে কাটিয়ে ছিলেন বিশাল সরোবর। সরোবরের মাছ থেকেই মাকে ভোগ দেওয়া হতো। সরোবরের নাম হয় ইছাই সরোবর। বহু শতাব্দী আগে এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠার পর থেকে গিয়েছিল গভীর জঙ্গলে। মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি, তারপর এই মন্দিরে আস্তানা নিয়েছিলেন ভবানী পাঠক। সেইসময় অজয়-দামোদর দিয়ে বহু বাণিজ্য হতো। ধনী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি ইংরেজরাও সেই বাণিজ্যে অংশ নিত। নদীপথে লক্ষ লক্ষ টাকার ব্যবসা চলত। স্থানীয় বাসিন্দারা না খেতে পেয়ে মরতেন। ভবানী পাঠক লুটের রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন। ইংরেজদের সম্পদ লুট করে গরিব মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার পণ নিয়েছিলেন। জানা যায়, এই কালীমন্দিরে পুজো করেই ভবানী পাঠক সম্পদ লুট করতে যেতেন। এনে বিলিয়ে দিতে গরিবদের মধ্যে। কালী মন্দির থেকে দুই নদীতে যাওয়ার জন্য সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিলেন তিনি। কালী মন্দিরের অদূরে বাড়ি তৈরি করতে গিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে সেই সুড়ঙ্গের হদিশ মেলে। প্রশাসনের তৎপরতায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যেখানে এসডিও অফিসটি রয়েছে তার অদূরের থাকা টিলাতেও একটি সুড়ঙ্গের হদিশ পাওয়া যায়। যা নাকি দামোদর নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। বিপদের আশঙ্কায় তাও বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। এভাবেই দুর্গাপুর বহন করে চলেছে ভবানী পাঠকের স্মৃতি। যার কেন্দ্রবিন্দুতে ভবানী পাঠকের কালীমন্দির। জানা যায়, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন তুঙ্গে উঠেছিল তখন বিপ্লবীদের ঠাঁই হয়েছিল এই মন্দিরে। এত শতাব্দী পরও সেই পরিবেশ যেন আজও বজায় রয়েছে ভবানী পাঠক কালী মন্দিরে। মন্দির চত্বরের বাইরে বিলাসবহুল বাড়ি ও আবাসন হলেও মন্দিরে রয়েছে বহু শতাব্দীপ্রাচীন একাধিক বটগাছ। মন্দিরের পিছনে এখনও রয়েছে বিশাল ইছাই সরোবর। আজও মন্দির চত্বরে ঘটা করে পালিত হয় স্বাধীনতা দিবস, সাধারণতন্ত্র দিবস। অনেকের বিশ্বাস, এই মা অত্যন্ত জাগ্রত। ভক্তরা আজও মায়ের টানে ছুটে আসেন। এলাকার বাসিন্দা মিলন চট্টোপাধ্যায় বলেন, প্রতিদিনই মাকে বন্দেমাতরম মন্ত্রে পুজো করা হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও ঘটা করে মন্দিরে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হবে। বর্ধমান থেকে মন্দিরে পুজো দিতে এসেছিলেন যুবক দিব্যজ্যোতি খাঁ। তিনি বলেন, মেডিক্যালের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য দুর্গাপুরে থাকতাম। সেই সময় প্রতিদিন মায়ের মন্দিরে আসতাম। সেই রীতি আজও বজায় রেখেছি। মাঝেমধ্যেই বর্ধমান থেকে আসি।