নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও সিউড়ি: পাথর, বালি, কালো টাকায় মরুশহর দুবাইয়ে বিপুল সাম্রাজ্য গড়েছেন কেষ্ট-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডল ওরফে নিজামউদ্দিন! সঙ্গে নিয়েছেন তাঁর বেয়াই বারিক বিশ্বাস ও জামাই আতিফকে। আরব দুনিয়ায় বসে বিনিয়োগ করেছেন সেখানকারই নির্মাণ ব্যবসায়। সব বিনিয়োগই অবশ্য জামাইয়ের নামে। দেশে থেকে হাওলা করে ১৫০০ কোটি পাঠিয়েছিলেন দুবাইয়ে। তারপর চুপিসাড়ে দেশ ছেড়েছেন। আশ্রয় নিয়েছেন সিটি অব গোল্ডে। কিনেছেন একাধিক বাংলো, ফ্ল্যাট, প্রাসাদোপম রিসর্ট। সূত্রের খবর, আমিরশাহির নাগরিকত্ব পর্যন্ত পেয়ে গিয়েছেন টুলু। তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর এমনই সব তথ্য হাতে এসেছে রাজ্য পুলিশের। ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দেশের সমস্ত বিমানবন্দরে লুক আউট সার্কুলার জারি হয়েছে। যাতে ভারতে ফিরলেই তিনি ধরা পড়েন। তবে জানা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে ‘ব্যবসার সূত্রে’ তুরস্কে রয়েছেন টুলু। ৫ আগস্ট দুবাই ফেরার কথা। দেশে তিনি আদৌ ফিরবেন কি না, সেই খবর মিলছে না। তবে বৃহস্পতিবারই পুলিশের আরজি মতো টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে সিউড়ি আদালত। তল্লাশি চলেছে তাঁর ‘রাজকীয়’ বাসভবনেও।
টুলু মণ্ডলের আত্মীয়ের বাড়ি থেকে নগদ ২৮ কোটি টাকা উদ্ধারের তদন্তে নেমে অফিসাররা জানতে পেরেছেন, বেআইনি পাথর ও বালি খাদান চালিয়ে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ এই ব্যবসায়ীর রোজগার ছিল দিনে এক কোটি টাকার উপর। পুরো নগদটাই বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখতেন। সূত্রের খবর, ঝাড়খণ্ডেও এই টাকায় পাথর খাদনের লিজ নিয়েছেন। যদিও টুলুর আশীর্বাদ পেয়েছেন শাসক-বিরোধী সব পক্ষই। তাই ‘কারবার’ চালাতে অসুবিধা হয়নি। তদন্তকারীরা জেনেছেন, কাঁড়ি কাঁড়ি এই নগদ তিনি আবার পাঠিয়েছেন বেয়াই মশাইয়ের কাছে। সেই বারিকের নামেও উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় সোনা চোরাচালান থেকে বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। সোনা সহ তাঁকে গ্রেপ্তারও করেছিল ডিআরআই। পুলিশ জেনেছে, টুলুর টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও দুবাইতে পাঠিয়ে বারিক বিশ্বাস নিয়ে এসেছেন সোনার বিস্কুট। সেই প্রমাণ মিলেছে উদ্ধার হওয়া সোনা থেকেই। তার মধ্যে রয়েছে ১৪টি লার্জ গোল্ড বার ও ১০০ গ্রাম ওজনের ১০টি সোনার বিস্কুট। তদন্তকারীরা এই বিস্কুট যাচাই করতে গিয়ে দেখেন, ২৪ ক্যারেটের এই সোনা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের। এগুলি দুবাই ও সুইৎজারল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল। ‘ক্যামোফ্লেজ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল সোনা পাচারের ক্ষেত্রে। তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, সোনার বারগুলোর গায়ে বিশেষ কালো কেমিকেল কোটিং করা হয়। মেটাল ডিটেক্টর ও স্ক্যানারকে বিভ্রান্ত করার জন্য। এক আধিকারিকের কথায়, বিমানবন্দর বা আন্তর্জাতিক সীমান্তে যখন যাত্রীদের ব্যাগেজ স্ক্যানিং মেশিনের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সোনা তার নির্দিষ্ট ঘনত্বের কারণে মেশিনের পর্দায় একটি নির্দিষ্ট রঙের ছায়া বা সংকেত তৈরি করে। তাতে ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে। সেই কারণে পাচারকারীরা বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ বা কালো টেপ দিয়ে সোনার উপর আস্তরণ তৈরি করে। তাতে স্ক্যানারে এর ঘনত্ব বা আকৃতি অন্য কোনো সাধারণ বস্তুর মতো দেখায়।
তদন্তে উঠে এসেছে, শুধু সোনা নয়, টুলুর কালো টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হয়েছে দুবাইতে। শেষ এক বছর ধরে এই হাওলার পরিমাণ বেড়েছিল। এই কাজেও তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন বারিক। তাঁর হাত ধরেই দুবাইয়ে পা রাখেন টুলু। এরপর বছরে অন্তত ১৫-২০ বার ওই দেশে যেতেন। তথ্য মিলছে পাসপোর্ট থেকেই। বাংলা থেকে হাওলার মাধ্যমে টাকা যেত দুবাই। সেখানকার বিভিন্ন নির্মাণকারী সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সেই টাকা ‘লগ্নি’ করতেন। রিপন স্ট্রিট এলাকার এক হুন্ডি ব্যবসায়ী এই টাকা পাচার করেছেন বলে অভিযোগ। সূত্রের খবর, নির্মাণ ব্যবসায় লগ্নি, রিসট কেনা ছাড়াও কোম্পানির নামে বিপুল পরিমাণ এফডি করেছিলেন টুলু। এবার এর উৎস নিয়ে শুরু হয়েছে খোঁজখবর। সিউড়ি জেলা আদালতের সরকারি আইনজীবী বিভাস চক্রবর্তী বলেন, ‘মিনার মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই পুরো রহস্য উন্মোচিত হবে। জেরার মুখেই মিনার স্বীকার করে নিয়েছেন, এই অঢেল সম্পত্তির আসল কারিগর টুলু মণ্ডল নিজেই।’