মণিরাজ ঘোষ, খড়্গপুর: প্রাচীনকালে সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন ও জলবায়ু বদল কি সামুদ্রিক বাণিজ্য ও মানবসভ্যতাকে প্রভাবিত করেছিল? এলিফ্যান্টা দ্বীপে ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন শিব-মাহাত্ম্য কি বিলীন হয়ে যাবে সমুদ্রগর্ভে? উত্তর খুঁজতে নামল খড়্গপুর আইআইটি। তাদের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা চালাবে মুম্বই বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (এএসআই)। এ জন্য ১ কোটি টাকা বরাদ্দ করছে মুম্বই বন্দর। শুক্রবার আইআইটি’র তরফে জানানো হয়েছে, দেড় হাজার বছর প্রাচীন এলিফ্যান্টা দ্বীপ শুধুই ধর্মীয় স্থান ছিল নাকি তা আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের ব্যস্ত কেন্দ্রও ছিল তা গবেষণার মাধ্যমে উঠে আসবে। এর পাশাপাশি জানা যাবে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে এলিফ্যান্টা দ্বীপে থাকা ভারতের সমৃদ্ধশালী ধর্মীয় সাংস্কৃতিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শিবের গুহামন্দির বিপন্ন হতে পারে কি না।
সম্প্রতি এএসআই’য়ের বিজ্ঞানী অভিজিৎ আম্বেকরের নেতৃত্বে এলিফ্যান্টার মোরাবন্দর এলাকায় খননকার্য চালানো হয়। সেখানে মিলেছে ১৬৫ বর্গমিটার আয়তনের এবং প্রায় ৮ মিটার গভীর বিশাল জলাধার ও সিঁড়ি যুক্ত কাঠামো। উদ্ধার হয় বড়ো মাপের সংরক্ষণ পাত্র, রোমান অ্যাম্ফোরার টুকরো, মেসোপটেমীয় উৎসের ‘টর্পেডো জার’ এবং অন্যান্য বিদেশি সামগ্রী। মিলেছে নোঙরের পাথর, ডুবে থাকা ঘাটের কাঠামো ও বসতির নিদর্শন। গবেষকরা জানান, রোমান অ্যাম্ফোরা ও মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন মৃৎপাত্র দিয়ে মূলত সুরা (মদ) বা তেল পরিবহণ হত। আম্বেকর বলেন, ‘প্রাচীন জনবসতির ধ্বংসাবশেষ ও বন্দরের নানা চিহ্ন প্রমাণ করে, এলিফ্যান্টা নিছক কোনো নির্জন ধর্মীয় স্থান ছিল না, বরং তা ছিল আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের এক ব্যস্ত কেন্দ্র।’ তবে বর্তমানে এলিফ্যান্টার আশপাশে কোথাও কোথাও জলের গভীরতা মাত্র ৫ মিটার। ফলে বড়ো জাহাজ যাতায়াত সম্ভব নয়। তা চলাচলের জন্য সাধারণত ১২ থেকে ১৫ মিটার গভীরতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে আইপিসিসি’র পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের জলস্তর ০.৪ থেকে ০.৮ মিটার এবং ভারতের পশ্চিম উপকূলে এক মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর ফলে মুম্বইয়ের নিচু এলাকা সহ এলিফ্যান্টার দেড় হাজার বছরের প্রাচীন শিবের গুহামন্দিরও বিপন্ন হতে পারে। প্রকল্পের প্রধান গবেষক খড়্গপুর আইআইটি’র ভূতত্ত্ব ও ভূ-পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক মেলিন্ডা বেরা জানান, ‘এলিফ্যান্টা ও পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে রেডিও কার্বন ডেটিং, পলির উৎস এবং বিভিন্ন আইসোটোপ বিশ্লেষণ করা হবে। প্রাচীনকালে ভারুচ বা নালা সোপারার মতো সমৃদ্ধশালী বন্দরের পতন হলেও কীভাবে এলিফ্যান্টা বিকাশ লাভ করেছিল গবেষণার মাধ্যমে তা জানা যাবে। পাশাপাশি এই গবেষণালব্ধ তথ্য বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ বুঝতেও সাহায্য করবে।’ অধ্যাপক অনিন্দ্য সরকার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রাচীন জনবসতি ও সমুদ্র বাণিজ্যের উপর কতখানি পড়েছিল, এই গবেষণায় সেই বিষয়ে নতুন তথ্য মিলতে পারে।’