ধর্ম জিনিসটা মানুষকে জীবনের সর্বক্ষেত্রেই প্রেরণা যোগায়। মানুষের জীবন সব কিছুকে নিয়েই। মানুষের জীবন একটা একক ফুল নয়, একটা ফুলের তোড়া। বিভিন্ন রঙের ফুল আছে, তাদের বিভিন্ন ধরণের রূপ-রস-গন্ধ আছে, তাদের বিভিন্ন ধরণের মাধুর্য আছে। তারা সেই মাধুর্য সবদিকে সবকোণে ছড়িয়ে দিয়ে চলেছে। এর ভেতরেই থেকে যাচ্ছে তার অস্তিত্বের সার্থকতা, অস্তিত্বের চরিতার্থতা। একজন মানুষ যদি ধার্মিক হয় সে জীবনের প্রতি পদবিক্ষেপে প্রতিটি স্তরে তার ধার্মিকতার চিহ্ন এঁকে যাবে। সে ব্যষ্টিগত জীবনে অন্যায় করবে না, অন্যায়কে সহ্য করবে না। সে সামাজিক জীবনে জনগোষ্ঠীর দ্বারা কোন অন্যায় হতে দেবে না, কোন অন্যায়কে সহ্য করবে না। মানুষের অস্তিত্ব জড়-স্থল-সুক্ষ্য-কারণ সব কিছুকে নিয়ে যাতে সব মানুষ সৎপথে থাকতে পারে, যাতে অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যবস্থা হয় তার দিকে সে তাকাবে; যাতে সমাজ জীবন দুঢ়ীভূত হয় সেদিকে সে নজর রাখবে। কারণ, সমাজ জীবনে ত্রুটি থাকলে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতির ফলে, সেই অর্থনৈতিক, সামাজিক ত্রুটির ফলে কেউ যদি চোর হয়, সেজন্যে সেই চৌর্যের দায়িত্ব যতটা তার, তার চেয়ে লক্ষ গুণ অধিক দায়িত্ব সমাজের। সমাজ তাকে চৌর্যবৃত্তিতে প্রবৃত্ত করেছিল।
শ্রীকৃষ্ণ যে যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন সে যুগে ভারত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীতে, ছোট ছোট রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। তারা একে অন্যের সঙ্গে কেবল সংঘর্ষে লিপ্ত হত। সেই সংঘর্ষ কোন আদর্শগত সংঘর্ষ ছিল না, সেই সংঘর্ষ ৰাধত তৎকালীন রাজাদের সাম্রাজ্যলিপ্সার দরুণ। এর পেছনে আর কোন দর্শন ছিল না, কোন শুভ ভাবনা ছিল না, কোন কল্যাণ-প্রেষণা ছিল না। কেবল ব্যষ্টিগত স্বার্থসিদ্ধি, ব্যষ্টিগত লোভবৃত্তি চরিতার্থ করবার জন্যে রাজারা একে অন্যের রাজ্যের ওপর আক্রমণ করত—এমনই সাম্রাজ্যলিপ্সা ছিল তাদের। তাদের মধ্যে ধর্মবোধের অভাব ছিল বলেই তারা এই অন্যায় কাজ করত। দেশ টুকরো টুকরো হয়ে ছিল। তখনকার দিনে দেশ মানে ছিল পামীর মালভূমি থেকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অর্থাৎ উত্তরে চীন, সাইবেরিয়া, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর, আর পূর্বে জাপান পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ড। কৃষ্ণ দেখলেন, এই ছোট ছোট দেশগুলো এককভাবে আত্মরক্ষায় অসমর্থ। যারা আত্মরক্ষায় অসমর্থ তারা জনকল্যাণেও অসমর্থ। তাই যাতে তারা আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে, যাতে তারা যথাযথভাবে জনকল্যাণ করতে পারে, তাই তিনি ঠিক করলেন, এক ধর্মরাজ্যে সবাইকে বেঁধে দেবেন, টুকরো-টুকরো ভারতকে এক করে দেবেন যাতে এই সংহত ও সংযত জনগোষ্ঠী, এই সংহত-সংযত ধর্মভিত্তিক ভারত মানুষ জাতিকে নোতুন পথ দেখাতে পারে; মানুষ জাতিকে নোতুন করে বুঝিয়ে দিতে পারে যে তুমি মানুষ, তোমাকে মানুষ হিসেবে মিলেমিশে এগিয়ে যেতে হবে, মিলেমিশে জনকল্যাণ করতে হবে। টুকরো-টুকরো খণ্ডীকৃত ভারত যাতে এক হয়, এক মহাভারত গড়ে ওঠে, তাই তিনি সমস্ত ধর্মবুদ্ধিসম্পন্ন রাজাদের, ধর্মবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের, কেবল রাজা নয়, সাধারণ মানুষকেও, শুধু সাধারণ মানুষ নয়, অবজ্ঞাত মানুষকেও—বিদুর কোন সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তিনি অবজ্ঞাত মানুষ ছিলেন—সবাইকে নিয়ে এক ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেবার প্রয়াস করলেন।
শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তির ‘কৃষ্ণতত্ত্ব ও গীতাসার’ থেকে