Bartaman Logo
৫ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হুঁশিয়ারি বনাম ব্যারিকেড

মহালয়া মানেই বাঙালির কাছে দেবীপক্ষের সূচনা। কিন্তু এবার তার সঙ্গেই জুড়ে গেল এক প্রতিবাদের ডাক—‘যেখানেই আটকাবেন, সেখানেই হবে যন্তরমন্তর! নিরাপত্তা ব্যবস্থা যত কঠোরই হোক, আগামী ১০ তারিখ আমরা দিল্লি পৌঁছাবই

হুঁশিয়ারি বনাম ব্যারিকেড
  • ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মহালয়া মানেই বাঙালির কাছে দেবীপক্ষের সূচনা। কিন্তু এবার তার সঙ্গেই জুড়ে গেল এক প্রতিবাদের ডাক—‘যেখানেই আটকাবেন, সেখানেই হবে যন্তরমন্তর! নিরাপত্তা ব্যবস্থা যত কঠোরই হোক, আগামী ১০ তারিখ আমরা দিল্লি পৌঁছাবই।’ হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখল ককরোচরা। গান্ধীজয়ন্তীর বিশেষ দিনটিকে বেছে নিয়ে শুক্রবার মুম্বইয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল তারা। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অসন্তোষ নতুন নয়। কিন্তু মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলন যখন দিল্লির যন্তরমন্তর ছাড়িয়ে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রশ্নটি আর নিছক কোনো একটি দলের সঙ্গে কমিশনের সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ককরোচদের ‘যন্তরমন্তর ২.০’ কর্মসূচি, কৃষকদের মহাপঞ্চায়েত, বাম ছাত্র-যুবদের সপ্তাহব্যাপী প্রতিবাদ, নাগরিক সমাজের পথে নামা—সব মিলিয়ে যে ছবি তৈরি হচ্ছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি শব্দ: আস্থা। ভোটার লিস্ট নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, রাজনৈতিক দলগুলির আপত্তি থাকতে পারে কমিশনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে, কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা একবার নষ্ট হলে পুলিশি ব্যারিকেড দিয়ে তাকে ফেরানো অসম্ভব। বরং আন্দোলনকারীদের রুখতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা কঠোরতর হলে অভিযোগকারীদের বক্তব্যের ধার ও ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পাবে। ‘যেখানেই আটকাবেন, সেখানেই যন্তরমন্তর!’—ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রধান অভিজিৎ দিপকের এই রাজনৈতিক হুঁশিয়ারির গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা আজ বিরাট। ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিবাদ হবে এবং সরকার তার জবাব দেবে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আর এর ব্যত্যয় ঘটলে, রাষ্ট্রের তরফে বলপ্রয়োগের অমানবিক রাস্তা গুরুত্ব পেলে বিতর্কের কেন্দ্র পথ হারায়। ইসিআইয়ের কাজকর্ম থেকে বিতর্ক সরে যায় রাষ্ট্রের ভূমিকার দিকে।

Advertisement

এখানেই দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও গুরুতর। ২০ জুলাই সংসদ অভিযান ঘিরে কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং পেরেক লাগানো ব্যাটন ব্যবহারের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো টাটকা। সেই অভিজ্ঞতার পরেই শোনা গিয়েছে দিপকের সতর্কবার্তা—‘ব্যাটন চালানোর ভুল করবেন না।’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অধিকার অবশ্যই সরকারের। সেই সীমা অতিক্রম করার অধিকার আন্দোলনকারীদেরও নেই। কিন্তু আইনশৃঙ্খলার অর্থ যদি হয় কেবলই বিরোধীদের কণ্ঠরোধ, তবে মর্যাদা হানি হয় সংবিধানের এবং ভারসাম্য হারায় গণতন্ত্রের প্রাণ। সরকার ও কমিশনের সমালোচনাকে ‘অশান্তি’ বলে চালাবার কৌশলটিও বিপজ্জনক। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য কি না, তাঁর পদত্যাগ আদৌ কতটা প্রয়োজন—তার বিচার হবে তথ্য, নথি ও সাংবিধানিক বিধির ভিত্তিতে। কিন্তু সেই বিচারের দাবি নস্যাৎ করে রাষ্ট্রিক দোর্দণ্ডপ্রতাপ জাহির কোনো সমাধান নয়। বরং কমিশনের নিজেরই উচিত অভিযোগগুলির বিশ্বাসযোগ্য জবাব দেওয়া। আর তা করা উচিত প্রকাশ্যে এবং যথাশীঘ্র সম্ভব। মনে রাখতে হবে—ইসিআইয়ের প্রধান শক্তি মানুষের আস্থা বিশ্বাস ভরসা—আইন, পুলিশ, এমনকি সংবিধানও নয়। আর সেই বিশ্বাসে ফাটল যাবতীয় কঠোর নিরাপত্তাও মেরামত করতে অপারগ। এই ভুল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটিকেই ভিতর থেকে দুর্বল করে দিতে পারে।
অতএব মহালয়ার আগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের চরম সময়সীমাকে কেন্দ্র করে রাজনীতি যতই উত্তপ্ত হোক, আসল প্রশ্ন প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে, ব্যক্তির গুরুত্ব সেখানে অতটা নয়। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ কোনো হুমকিতে নির্ধারিত হওয়ার বিষয় নয়, আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তাঁকে পদে বহাল রাখার কৌশলটিও গণতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। অভিযোগ সত্যিই ভিত্তিহীন হয়ে থাকলে তথ্যসহযোগে তা প্রমাণ করার দায় সরকারের। কমিশন তার পদক্ষেপগুলিকে স্বচ্ছ ভেবে থাকলে সেই স্বচ্ছতার দরজা আরও উন্মুক্ত করার ব্যবস্থা নিক তারা। অন্যদিকে, বিরোধী পক্ষের উদ্দেশে বলার বিষয় হল, আন্দোলনের শক্তি কিন্তু তার শান্তিপূর্ণ ও যুক্তিনিষ্ঠ চরিত্রেই নিহিত। রাজপথে জমায়েতের বহর কিংবা হুঁশিয়ারির তীব্রতায় কিছু নির্ধারিত নাও হতে পারে। ভোটার তালিকায় নাগরিকের নাম, প্রদত্ত ভোট এবং ভোটের ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চয়তা বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখাই শেষকথা। সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে ‘যন্তরমন্তর ২.০’ ঘোষিত হয়ে থাকলে  তার মোকাবিলায় ব্যারিকেড কোনো কৌশল নয়, বরং আস্থা বিশ্বাস ভরসা ফেরানোই বিশল্যকরণী। গণতন্ত্রের সবচেয়ে উঁচু ব্যারিকেডটি কোনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে নেই, সেটি কোটি কোটি ক্ষুব্ধ মানুষের মনে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ