প্রীতম দাশগুপ্ত: কুমকুম মোহদ, প্রণাভি উরস, লাভলিনা বরগোঁয়াই কিংবা নীরু ধান্ডা। কয়েকটা নাম। সদ্যসমাপ্ত এশিয়াডে ভারতীয় দলের সোনাজয়ী কয়েকজন মহিলা। সংখ্যার হিসাবে ২১ জনের মধ্যে ১১ জন। মিসাইল উইমেন টেসি টমাস অথবা রকেট উইমেন রীতু কারদিয়াল শ্রীবাস্তব। আইএএস টিনা দাবি থেকে আইপিএস কিরণ বেদী। অপারেশন সিন্দুরের দুই মুখ কর্নেল সোফিয়া কুরেশি কিংবা উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিং। রাজনীতির আঙিনায় ইন্দিরা গান্ধী থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রুপোলি পর্দার সুচিত্রা সেন থেকে দীপিকা পাড়ুকোন। দেশকে নাড়িয়ে দেওয়া সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়া থেকে গৌরী লঙ্কেশ। আমাদের দেশেই নানাবিধ ফিল্ডে সফল ভারতীয় মহিলার সংখ্যা কম নয়। অথচ আধুনিক ভারতেই এক চরম বৈপরীত্য দেখা যায়। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যার মৌলিক নাগরিক অধিকার অর্থাৎ নির্ভয়ে বাঁচার এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকারই এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। নারী যে শুধুমাত্র শারীরিক হিংসারই শিকার এমন নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে তাঁর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এক ধরনের প্রতিবন্ধকতাও। সবমিলিয়ে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও নারী নিরাপত্তা নজরদারির কাঠগড়ায় বন্দি।
সাম্প্রতিক সময়ে মহিলাদের বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধের ঘটনা লক্ষ্য করা গিয়েছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মরাল পুলিশিং বা নীতি পুলিশের তাণ্ডব। এমনকি এক মন্ত্রীকেও বলতে শোনা গিয়েছে, নীতি পুলিশের কাজটা আরও একটু শালীনভাবে করলেই হত। ওই মন্ত্রী আবার একজন মহিলা। এ এক অদ্ভুত সমাজ। এখানে অপরাধীকে নিবৃত্ত করার পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। বরং নারীর ব্যক্তি জীবন, পোশাক, গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করাই মুখ্য হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে নারীকে গৃহবন্দি বা শৃঙ্খলাবদ্ধ করার এই অপচেষ্টা আধুনিক ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সামনে এক বড়োসড়ো প্রশ্নচিহ্ন। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘একটি ছেলে যখন ইচ্ছা বাইরে যেতে পারে, দেরি করে বাড়ি ফিরলেও তাকে কিছু বলা হয় না। অথচ মেয়েদের রাত ৮টার মধ্যে বাড়ি ফেরার নিয়ম। ছেলেরা যে কোনো পরীক্ষায় একাধিকবার অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়, কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে সুযোগ থাকে মাত্র একবার। এমনকি তাদের বলা হয়, এখন তো তোমার বিয়ের সময় হয়ে গিয়েছে, আর পরীক্ষায় বসে কী হবে?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে তিনটি ঘটনা আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। একটি বিহারের জামুইয়ে। দ্বিতীয়টি খোদ দেশের রাজধানী দিল্লিতে। আর শেষ ঘটনাটি পাঞ্জাবের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। জামুইয়ে একটি কিশোরী তার বন্ধুর সঙ্গে টিউশন সেরে বাড়ি ফিরছিল। নীতি পুলিশ হিসাবে চলে আসে একদল যুবক। কিশোরকে মারধর ও কিশোরীর শ্লীলতাহানি করে তারা। ভাইরাল ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছে, কিশোরী হাতজোড় করে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু পাত্তাই দেয়নি অভিযুক্তরা। এরপর শাসক শিবির এটিকে ‘ছোটোখাটো ঘটনা’ বলে দাগিয়ে দিয়েছিল। পাঞ্জাবের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াকে ধর্ষণের অভিযোগে ব্যাপক গোলমাল হয়। দক্ষিণ দিল্লির কালকাজিতে আস্থা কুঞ্জ পার্কে ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে তিনজন। তারা আবার পুলিশ সেজে এসেছিল। এটি যে স্রেফ রাজধানী বা কোনো একটি রাজ্যের সমস্যা, তা নয়। এটি দেশের সমস্যা। এনসিআরবির তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে দেশে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনা ঘটেছে ৪ লক্ষ ৪১ হাজার ৫৩৪টি। নারী অধিকার সংগঠনগুলির দাবি, বেসরকারিভাবে এই সংখ্যাটা নিশ্চিতভাবেই বেশি। কারণ বহু ক্ষেত্রেই লোকলজ্জার ভয়ে মহিলারা বা তার পরিবার অভিযোগ দায়ের করতে চায় না।
ভারতে যখনই কোনো যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তখন অপরাধীর বিচারের চেয়েও বেশি আলোচিত হয় নির্যাতিতার ভূমিকা। ‘কেন তিনি একা ছিলেন?’, ‘কী পোশাক পরেছিলেন?’, ‘মদ খেয়েছিলেন কি না?’, কিংবা ‘রাত ১০ টার পর ঘরের বাইরে কেন ছিলেন?’—এই প্রশ্নগুলি অপরাধীকে একপ্রকার দায়মুক্তি দেয়। অপরাধীর থেকে নির্যাতিতার উপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার এই মানসিকতাই আসলে নীতি পুলিশিকে সমাজে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। আসলে নারী হলেই আমাদের সমাজ সুরক্ষার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। সেখানে সুরক্ষার নামে মেয়েদের রাতে বের হতে বারণ করা হয়। বলা হয়, একা একা কোথাও যাবে না। নির্জন জায়গায় যাবে না। মনে রাখা দরকার, সতর্কতার পরামর্শ দেওয়া ভালো। কিন্তু যদি সতর্কতার নামে নারীর স্বাধীনতার উপর স্থায়ী বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তাকে আর সুরক্ষা বলে না। বলা হয় নিয়ন্ত্রণ। এটি আসলে স্বাধীনতার বিপরীত ধারণা। তাই প্রশ্নটা হল, আমরা কোনটা চাই নারীর নিরাপত্তা, নাকি তাঁদের স্বাধীনতার উপর খবরদারি?
ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হয়েছে। আবার ১৯(১) অনুচ্ছেদ অবাধ চলাচলের অধিকার দিয়েছে। ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে সুরক্ষিত করে। শুধু সংবিধানই নয়, সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, প্রাপ্তবয়স্ক যে কোনো ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী জীবন যাপন করা এবং ভয়হীনভাবে চলাফেরা করা মৌলিক অধিকার। কোনো স্বঘোষিত সমাজ বা খাপ পঞ্চায়েতের সেখানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারতীয় দণ্ডবিধি বা বর্তমান ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় নীতি পুলিশের কোনো সংজ্ঞা নির্ধারণ হয়নি। নীতি পুলিশগিরি যে আসলে একটি অপরাধ এবং এর জন্য কঠোর সাজা হবে, এমন কথা কোথাও বলা হয়নি। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। যারা নৈতিকতার দোহাই দিয়ে মহিলাদের হেনস্তা করে, তারা খুব সহজেই সাধারণ ধারায় জামিন পেয়ে যায়। আইনের ফাঁকফোকর এবং প্রশাসনের একাংশের মৌন সম্মতি এই নীতি পুলিশ ব্যবস্থাপনাকে এক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত করেছে। প্রশ্নটা হল, কোনটা নৈতিক আর কোনটা অনৈতিক, সেটা কে ঠিক করবে? একজন মহিলা কতটা স্বাধীনতা ভোগ করবেন, সেটা ঠিক করার অধিকার কার?’
আমাদের সমাজে মেয়েদের যেমন শিক্ষার পাঠ দেওয়া হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে তেমন হয় কি? আমরা আমাদের ছেলেদের কতবার শেখাই, সম্মতি ছাড়া মেয়েটিকে স্পর্শ করা যাবে না। মেয়েটি কী পোশাক পরবে, সেটি তাঁরই বিচার্য। এর মধ্যে তোমার মাথা ঘামোনোর কিছু নেই। তোমার সেই পোশাক পছন্দ না হলেই, তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। কোনো মেয়ে যদি রাতে চলাফেরা করে, তাহলেই তাকে হেনস্তা করার অধিকার জন্মায় না। ‘নো মিনস যে নো’-ই হয়-এগুলি শেখানো হয় না। তাই আজও মেয়েদের রাস্তায় নামতে হয়। ‘রাত দখল’ করতে হয়। বলতে হয় রাত আমাদেরও।দিল্লির ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাও বলেছেন, মেয়েদের যেমন কোনটা করা উচিত, আর কোনটা নয়, শেখানো হয়, ছেলেদেরও তেমন শেখানো উচিত। দিল্লির ঘটনার প্রতিবাদে বিভিন্ন কলেজের ছাত্রীরা রাস্তায় নেমেছিলেন। মুখে স্লোগান, ‘এক কচুরি, দো সমোসা। ইন মর্দ কা কেয়া ভরোসা।’ কিংবা ‘ঠান্ডি চায়ে গরম করো, মর্দ জাত শরম করো।’ এর আগে উওম্যান ওয়াক অ্যাট মিডনাইট কর্মসূচিতে প্রায় ৬০ জন মহিলা মধ্যরাতে হাঁটেন। তাঁরা কোনো বিশেষ অধিকার দাবি করেননি। স্রেফ দাবি করেছিলেন, যে নাগরিক স্বাধীনতা পুরুষ ভোগ করে, সেটি নারীরও। আসলে এটা বুঝতে হবে, নিরাপত্তার পাঠ শুধু মেয়েদের দিলে, অপরাধপ্রবণতা কমে না। একটাই হয়, মেয়েদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়।
আজকের দিনে সমাজ মাধ্যম একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র। সেখানেও অহরহ নারীকে হেনস্তার সম্মুখীন হতে হয়। সমাজ মাধ্যমে কোনো নারী নিজের পছন্দের পোশাক, রাজনৈতিক মতামত অথবা স্বাধীন জীবনধারার ছবি পোস্ট করলেই দেখবেন ধেয়ে আসছে তির। নানাবিধ কুরুচিকর মন্তব্য অথবা ‘চরিত্রহনন’ করা হচ্ছে। এমনকি গণধর্ষণের হুমকি দেওয়াও বাদ যাচ্ছে না। এখন এটি একটি স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
একটা রাষ্ট্র কখন বিশ্বগুরু হতে পারে? যখন সে আর্থিকভাবে বলশালী হয় এবং তার নাগরিকরা রাজপথে নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারে।কিন্তু ৭০ কোটি জনসংখ্যাকে আতঙ্কে রেখে অর্থনৈতিক পরাক্রম দেখানো যায় না। আর অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হলে সামরিক দিক থেকেও দীর্ঘদিন শক্তিশালী থাকা যায় না।
মনে রাখা উচিত, পাখিকে সোনার খাঁচায় রেখে দিলেও সেটাকে বন্দিদশাই বলে। ভারতের প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও মানবিক অগ্রগতি তখনই সম্ভব হবে, যখন কোনো নারীকে বাইরে বের হওয়ার আগে সময়, পোশাক কিংবা সুরক্ষার কথা ভেবে ভয় পেতে হবে না। রাষ্ট্র ও সমাজ যখন সুরক্ষার নামে নজরদারি বন্ধ করবে।নারী নিরাপত্তা প্রকৃত অর্থে তখনই কার্যকর হবে, যখন মেয়েদের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত করা হবে না, বরং তাঁদের স্বাধীনভাবে বাঁচার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হবে। এর জন্য প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা সবচেয়ে জরুরি। কেন এমন অপরাধ হল, এর জন্য যদি আধিকারিকদের জবাবদিহি করতে না হয়, তবে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাবে না।