Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজধর্ম অস্বীকার

অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি, এমনকি উদ্বোধনও হয়ে গিয়েছে। রামমন্দির গড়ার ধুয়ো তুলে বিজেপি কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করেছে একাধিকবার। উত্তরপ্রদেশসহ কয়েকটি রাজ্যজয়ের পিছনেও রামলালার আশীর্বাদ ছিল বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান।

রাজধর্ম অস্বীকার
  • ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি, এমনকি উদ্বোধনও হয়ে গিয়েছে। রামমন্দির গড়ার ধুয়ো তুলে বিজেপি কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করেছে একাধিকবার। উত্তরপ্রদেশসহ কয়েকটি রাজ্যজয়ের পিছনেও রামলালার আশীর্বাদ ছিল বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান। কিন্তু রামমন্দির উদ্বোধনের পর ভোটের ঝুলিতে উলটপুরাণই দেখেছে বিজেপি। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে দেশে তো বটেই ইউপিতেও গেরুয়া শিবির এই ইস্যুর ফায়দা পায়নি। এমনকি খোদ অযোধ্যাতেও (ফৈজাবাদ আসন) জয় পায়নি বিজেপি। বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজেপি প্রার্থী প্রায় ৫৫ হাজার ভোটে এসপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। ২০২৪-এ নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে কেন্দ্রে তৃতীয় এনডিএ সরকার তৈরি হলেও অস্বস্তি ছিল বড়ো রকমের। কারণ সংসদে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতার দাপট খুইয়েছিল পদ্ম প্রতীক। সব মিলিয়ে এই বার্তাই স্পষ্ট হয় যে, ভোটারদের মনে মন্দির ইস্যুর প্রভাব নিম্নগামী।

Advertisement

গোবলয়ের ছবি যখন এই, সেখানে বাংলার উদার জনমানসে, রাজনীতি সচেতন সমাজে মন্দির বস্তুটি যে ‘খাওয়ানো’ যাবে না, তা বিজেপির থিঙ্কট্যাঙ্কেরও অজানা নয়। অতএব তাঁরা বিকল্প হাতিয়ার খুঁজছিলেন। নয়া হাতিয়ারের সন্ধানে নেমে বিজেপিকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হয়েছে তিনটি জিনিস: (এক) বাংলায় প্রতিপক্ষের নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা-মাটি-মানুষের পার্টি তৃণমূল কংগ্রেস। (দুই) ২০২১ বিধানসভা এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মুখ চুন হয়েছিল মোদি-শাহ অ্যান্ড কোং-এর। (তিন) বিজেপির প্রতিষ্ঠাতাপুরুষ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্যে মোদির নেতৃত্বে সরকার তৈরির সম্ভবত এবারই শেষ সুযোগ। তাহলে মমতার জনমুখী সরকার সরিয়ে বাংলার ক্ষমতা দখলের জন্য বিজেপির তরফে কোন ভূমিকা কাম্য ছিল—কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে বাংলার উন্নয়নে সার্বিকভাবে ব্যবহার করা। ধর্ম বর্ণ অঞ্চল নির্বিশেষে বাংলার মানুষের মনজয়ের জন্য এর বিকল্প কিছু নেই। তাতে রাজ্যজুড়ে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মাথা উঁচু হতে পারত। তাঁরা বড়ো মুখ করে মানুষের কাছে ভোট চাইতে গেলে অভিনন্দন পেতেন, এখনকার মতো গাল খেতে হত না। কিন্তু বিজেপির বাংলার নেতা থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কাউকেই সেই ভূমিকায় দেখা যায়নি। উলটে তাঁরা মনোনিবেশ করেছেন বাংলার সঙ্গে চূড়ান্ত বঞ্চনা, প্রতারণা এবং ধর্মীয় বিভাজন আর ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর ব্যাপারে। একাধিক ডবল ইঞ্জিন সরকার, কেন্দ্রীয় এজেন্সি এবং সোশ্যাল মিডিয়াকেও ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাকে হেয় করার জন্য। গেরুয়া শিবিরের এই কারবারের উল্লেখযোগ্য একটি পার্ট হল এসআইআর। মূল উদ্দেশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোটব্যাংক বলে পরিচিত ভোটচিত্রকে ছেঁটে ঘেঁটে দেওয়া। বঙ্গ বিজেপির এক নেতা তো ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এসআইআরে তৃণমূলের দেড় থেকে দুই কোটি ভোটার হাওয়া হয়ে যাবে! কারণ ওই ভোটারদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি/রোহিঙ্গা মুসলিম এবং মৃত/ভুয়ো! দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বারবার দাবি করেছেন, তৃণমূলের সহায়তায় বাংলা ঘুসপেটিয়া বা অনুপ্রবেশকারীতে ভরে রয়েছে! আর মমতার উপর্যুপরি বিপুল জয়ের রহস্য নাকি এটাই। এসআইআর করে মমতাকে এবার ফাঁদে ফেলা হবে বলেও তাঁরা হুংকার ছাড়েন বারবার। 
কিন্তু বাস্তবটা কী? যে অনুপ্রবেশ নিয়ে মোদি-শাহদের এত ঢক্কানিনাদ, তার পর্যাপ্ত তথ্যই নেই কেন্দ্রের কাছে! এমনই সাক্ষ্য দিচ্ছে আরটিআই। এই সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকই জানিয়েছে, বর্তমানে ভারতে কোন দেশের কত অনুপ্রবেশকারী রয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, কতজনকেই-বা পুশব্যাক করা হয়েছে, তার কোনো কেন্দ্রীভূত তথ্য সরকারের কাছে নেই। তাহলে জনসভা থেকে সোশ্যাল মিডিয়া—সর্বত্র যে কোটি কোটি বাংলাদেশি/রোহিঙ্গার দাবি তাঁরা করে থাকেন, তার ভিত্তি কী? মুসলিম অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে গেরুয়া শিবিরের তর্জনী বাংলার দিকেই উঁচু হয়ে রয়েছে সবসময়। এরপরই অসমের স্থান। এই প্রেক্ষিতে এই অনুমান কি যথার্থ নয় যে, অনুপ্রবেশের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু আসলে বিজেপির নির্বাচনি চমক মাত্র। সবটাই গেরুয়া জুমলা। আরটিআই কর্মী কানহাইয়া কুমার জানতে চেয়েছিলেন, গত দশবছরে দেশজুড়ে কোন দেশের কতজন অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে? প্রত্যর্পণই-বা করা হয়েছে কতজনকে? জবাবে গত ২৩ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় মন্ত্রক স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। পুরো বিষয়টি অবশ্য রাজ্যের ঘাড়ে ঠেলে দিয়ে দায় সারতে ব্যগ্র কেন্দ্র। মোদির পার্টি ও সরকারের এই ভূমিকা দুর্ভাগ্যজনক। দেশের সংবিধানরক্ষা এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে শাসকের সংযম ও নৈতিকতা জরুরি। রাষ্ট্র উন্নয়নে আগ্রহী এবং কল্যাণকামী হলে তাকে অন্তর্ভুক্তির নীতিতেই অবিচল হতে হবে। সেখানে বিজেপি এবং মোদি সরকার উলটো পথে হাঁটার একটাই অর্থ—রাজধর্ম পালন অস্বীকার। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ