


বিশেষ নিবন্ধ, সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ঘড়িতে সময় দুপুর ১টা ২২ মিনিট ২৫ সেকেন্ড। আচমকাই কলকাতা থেকে ঢাকা—সর্বত্র মুহূর্তের জন্য থমকে গেল কয়েক কোটি মানুষের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। পায়ের তলার মাটি যখন দুলতে শুরু করল, তখন অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন, এটি সাধারণ কোনো কম্পন। কিন্তু আম জনতার কপালে চিন্তার সামান্য ভাঁজ পড়েছিল এই ভূমিকম্পের ধরনে। মনে হয়েছিল, অতীতের ছুটকোছাটকা কম্পনের থেকে এবারের মাত্রাটা বোধহয় একটু বেশিই। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। জানা গেল, অনুমান অভ্রান্ত। ভূ-পদার্থবিদদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ এবং ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এনসিএস)-র রিপোর্ট বলছে, এই ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল এক ভয়ংকর বিপদের আগাম ‘ট্রেলার’। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের সাতক্ষীরা অঞ্চলে ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৯-১০ কিলোমিটার গভীরে ঘটা এই ‘শ্যালো ফোকাল ডেপথ’ বা অগভীর কম্পনটি মাটির উপরিভাগে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত করেছে, তা যে কোনো বড়ো শহরের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একদিকে সিকিমে ২০ দিনে ৫০ বারের বেশি কম্পন, অন্যদিকে বাংলাদেশের খুলনা বা সিলেট রিজিয়নে (যা টের পাওয়া যাচ্ছে এপার বাংলাতেও) ঘনঘন ভূ-আলোড়ন—সব মিলিয়ে পূর্ব ভারত এখন এক সিসমিক টাইম-বোমার উপর দাঁড়িয়ে।
এপিসেন্টার: সাতক্ষীরা-টাকি
এনসিএসের তথ্য অনুযায়ী, এই কম্পনের কেন্দ্রস্থল ছিল উত্তর ২৪ পরগনার টাকি থেকে মাত্র ২৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, বাংলাদেশের সাতক্ষীরায়। টেকটোনিক বিচারে এই অঞ্চলটি অত্যন্ত জটিল। এটি মূলত ভারতীয় প্লেট, বার্মা (মায়ানমার) মাইক্রোপ্লেট এবং সুনদা প্লেট সিস্টেমের এক ত্রিবেণী সঙ্গম। ভূ-পদার্থবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পের নেপথ্যে রয়েছে ‘রাইট ল্যাটারাল স্ট্রাইক স্লিপ মেকানিজম’। স্কুলের ভূগোলের ভাষায় একটু সহজ করে বললে ভূ-গর্ভের চ্যুতিরেখাগুলি একে অপরের গা ঘেঁষে আড়াআড়িভাবে সরে গিয়েছে। বেঙ্গল বেসিনের এই অংশে প্রায় ১৬ থেকে ২০ কিলোমিটার পুরু পলিমাটির স্তর রয়েছে, যার নীচে চাপা পড়ে আছে প্রাচীন ক্রিটাসাস এবং গন্ডোয়ানা যুগের শিলা। যখনই এই গভীরে থাকা পুরানো বেসমেন্ট ফল্টগুলি নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখনই এমন কম্পনের সৃষ্টি হয়।
ইওসিন হিঞ্জ ও ‘জেলি’ এফেক্ট
কলকাতার নীচ দিয়ে চলে গিয়েছে ‘ইওসিন হিঞ্জ’ নামে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল চ্যুতিরেখা। এটি এমন এক ঢালু ভূ-স্তর যা গাঙ্গেয় উপত্যকাকে বঙ্গোপসাগরের গভীর অববাহিকার সঙ্গে যুক্ত করেছে। সাম্প্রতিকতম ভূমিকম্পের এপিসেন্টার সাতক্ষীরা এবং টাকি অঞ্চলটি এই ‘ইওসিন হিঞ্জ জোন’-এর কাছে অবস্থিত। টাকি থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সাতক্ষীরার দিকে গেলেই দেখা যায়, ভূ-গর্ভের কঠিন শিলাস্তর আরও গভীরে নেমে গিয়েছে এবং পলিমাটির স্তর আরও পুরু হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এই অঞ্চলের নরম এবং জলসিক্ত পলিমাটি ভূমিকম্পের তরঙ্গকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সিসমিক অ্যামপ্লিফিকেশন’। কম্পনের সময় এই মাটি অনেকটা ‘জেলি’-র মতো আচরণ করে। যার ফলে উৎসস্থল থেকে ১৮৫ কিলোমিটার দূরে থাকা ঢাকা বা ৮১ কিলোমিটার দূরের কলকাতাতে বসেও তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে।
বিপদের মাত্রা
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ তথ্যটি দিয়েছেন ভূ-বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এই অঞ্চলে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং
বার্মিজ প্লেটের সংঘর্ষের ফলে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি গত কয়েকশো বছর ধরে জমা হয়েছে, ২৭ ফেব্রুয়ারির এই ভূমিকম্পে তার ১ শতাংশের কম শক্তি নির্গত হয়েছে। অর্থাৎ, বাকি ৯৯ শতাংশ শক্তি এখনো মাটির নীচে ‘লকড’ অবস্থায় রয়েছে। ভূ-তাত্ত্বিকদের আশঙ্কা, অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে ৮.২ থেকে ৯.০ মাত্রার একটি ‘গ্রেট আর্থকোয়েক’ বা মহাকম্পন হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। এই ৫.৫ মাত্রার কম্পনটি সম্ভবত সেই মহাপ্রলয়ের একটি ‘ফোর-শক’ বা প্রস্ততিমূলক মহড়া।
এক সুতোয় সিকিম থেকে বাংলা
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সিকিমের পরিস্থিতি সবথেকে উদ্বেগজনক। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে সিকিম। সেখানে ২০ দিনে ৫০ বারের বেশি কম্পন অনুভূত হয়েছে। আসলে সিকিম হিমালয়ের এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে তিনটি প্রধান চ্যুতিরেখা— ‘মেইন সেন্ট্রাল থ্রাস্ট’, ‘মেইন বাউন্ডারি থ্রাস্ট’ এবং ‘তিস্তা ফল্ট’ একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই ফল্ট লাইনগুলি এখন আর ‘লকড’ অবস্থায় নেই। বরং প্রতিনিয়ত সেখানে ঘর্ষণ বাড়ছে। সেই কারণেই বার বার কেঁপে উঠছে সিকিম। প্রশ্ন উঠতে পারে, সিকিমের এই ঘন ঘন ছোটো মাত্রার কম্পনগুলি কি আসলে ‘গ্রেট হিমালয়ান আর্থকোয়েক’-এর পূর্বাভাস? ভূতত্ত্ববিদদের একাংশ মনে করছেন, এই কম্পন হিমালয়ের পাদদেশে তৈরি হওয়া প্রচণ্ড চাপের বহিঃপ্রকাশ। হিমালয়ের তলায় যে বিপুল পরিমাণ স্থিতিশক্তি জমা হয়েছে, তা এখন বেরোনোর পথ খুঁজছে। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং থেকে শুরু করে গ্যাংটক পর্যন্ত যে চ্যুতিরেখাগুলি রয়েছে, সেগুলি এই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের চ্যুতিরেখাগুলির সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে হিমালয়ের ধাক্কা যখন দক্ষিণে পরিবাহিত হয়, তখন পিংলা ফল্ট বা দেবগ্রাম-বগুড়া ফল্টের মতো বেঙ্গল বেসিনের সুপ্ত ফল্ট লাইনগুলি ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত ২৭ তারিখের কম্পনটি ছিল সেই চেইন রিয়্যাকশনেরই একটি অংশ।
তাসের ঘর
কলকাতা শহরে আর জায়গা নেই বললেই চলে। তা বলে উন্নয়ন তো থেমে থাকতে পারে না। তাই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে উন্নয়ন। বারাসত-মধ্যমগ্রাম থেকে রাজারহাট-নিউটাউন হয়ে দক্ষিণে সোনারপুর-বারুইপুর পর্যন্ত। আকাশচুম্বী হাই-রাইজ কালচারের হাত ধরে আমাদের নগরজীবনের বিস্তৃতি বাড়ছে। কিন্তু বিপদ! সেকথা ভাবা পাপ। আসলে সুখের সময় আর মানুষের স্বার্থে ভয়কে ডরালে চলে না। তাই পরিবেশ ধ্বংস করে, মনের আনন্দে জলাভূমি বুজিয়ে ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। উন্নয়নের এই ব্যস্ততার মধ্যে আমরা ভুলে গিয়েছি যে, ভারতের প্রায় ৫৯ শতাংশ ভূখণ্ড ভূমিকম্পপ্রবণ হলেও কলকাতা তাদের মধ্যে একটু আলাদা। আমাদের মহানগরী ‘সিসমিক জোন ৪’-এর অন্তর্ভুক্ত। (জোন ৫ হল সবথেকে বিপজ্জনক। কলকাতা ঠিক তার আগের স্তরে রয়েছে)। কিন্তু এর থেকেও বড়ো বিপদ হল ‘সয়েল লিকুইফ্যাকশন’। সেটা কী বস্তু? কখনো কখনো কম্পনের তীব্রতায় মাটির কণাগুলো আলগা হয়ে যায় এবং মাটির নীচে থাকা জল উপরে উঠে আসে। ফলে শক্ত মাটি কাদার মতো তরল হয়ে যায়। শহর কলকাতা থেকে শহরতলির অধিকাংশ বহুতলই এই নরম পলিমাটির উপর দাঁড়িয়ে। আর সেই সমস্ত বহুতল তৈরির সময় অনেক ক্ষেত্রেই সিসমিক সেফটি কোড (আইএস ১৮৯৩) মানা হয় না। ফলে ৬.৫ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে এই বহুতলগুলি স্রেফ মাটির নীচে বসে যেতে পারে বা তাসের ঘরের মতো হেলে পড়তে পারে। জলাভূমি ভরাট করে তৈরি হওয়া নিউটাউন বা রাজারহাটের মতো এলাকাগুলিতে এই ঝুঁকি সবথেকে বেশি।
শুধু কলকাতা ও শহরতলি নয়, ঢাকার মতো মেগাসিটিগুলিতেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলাভূমি ভরাট করে তৈরি হওয়া বহুতলগুলি এখন ভূমিকম্প নামক এক ধ্বংসাত্মক ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে। কারণ নরম পলিমাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকা বহুতলগুলির ‘ন্যাচারাল ফ্রিকোয়েন্সি’ যদি ভূমিকম্পের তরঙ্গের সঙ্গে মিলে যায়, তবে অনুরণনের (রেজোন্যান্স) ফলে বহুতলগুলি স্রেফ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
এছাড়াও আরও একটি ভয়ের বিষয় রয়েছে। ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট কেয়ার’-এর একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, অতিরিক্ত পরিমাণে ভূ-গর্ভস্থ জল তুলে নেওয়ার ফলে (মুড়িমুড়কির মতো ফ্ল্যাট তৈরি হলে জল তো লাগবেই) কলকাতার মাটি ক্রমেই বসে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ভূমিকম্পের সংযোগ ঘটলেই কেল্লা ফতে। ২০৩০ সালের মধ্যে শহরের একটা বড়ো অংশ হয় বসে যাবে নয়তো জলমগ্ন হয়ে পড়বে।
বাঁচার পথ
ভূমিকম্প রোখার ক্ষমতা বিজ্ঞানের নেই। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই কমানো সম্ভব। সেই পর্বে প্রথমেই আসে জলাভূমি ভরাট বন্ধ করা ও ‘সিসমিক মাইক্রোজোনেশন’-এর বিষয়টি। প্রতিটি শহরের কোন এলাকায় মাটির চরিত্র কেমন, তা বুঝে নির্মাণ কাজ করতে হবে। পাশাপাশি করতে হবে স্ট্রাকচারাল অডিট। পুরানো বাড়ি থেকে বহুতল এবং ফ্লাইওভারগুলি কতটা কম্পন সহ্য করতে সক্ষম, সেই ক্ষমতাও যাচাই করতে হবে। প্রয়োজন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমও। ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় সরকারের উচিত যৌথভাবে একটি রিয়েল-টাইম সেন্সর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যা অন্তত কয়েক সেকেন্ড আগে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করতে পারবে। জাপানের মতো আমাদের প্রতিটি স্মার্টফোনেও অটোমেটিক সিসমিক অ্যালার্ট সিস্টেম চালুর জন্য দুই দেশের টেলিকম মন্ত্রককে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি স্কুল ও আবাসনগুলোতে নিয়মিত ভূমিকম্প মোকাবিলার মহড়া চালানো দরকার।
শেষ কথা
প্রকৃতি আমাদের এখন ওয়ার্নিং দিচ্ছে। ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু সেই সুযোগ চিরকাল থাকবে না। এবারের কম্পন বুঝিয়ে দিল যে, বেঙ্গল বেসিনের শান্ত চেহারার নীচে এক অশান্ত দৈত্য জেগে উঠছে। এরপর যখন ৯ মাত্রার কম্পন আসবে, তখন আর পালানোর পথটুকুও হয়তো পাওয়া যাবে না। তাই এখনই নির্মাণ বিধি কঠোর করা এবং নাগরিকদের সচেতন করার সময়। পলিমাটির উপরে বসে থাকা এই জনপদকে রক্ষা করতে হলে আমাদের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। কারণ, মাটির নীচের কম্পন কোনো সীমানা মানে না, সে কেবল ধ্বংসের ভাষা বোঝে। আগেভাগে সতর্ক না হলে ভূমিকম্প পরবর্তী কোনো এক সকালে আমার-আপনার ঠাঁই হবে মাটির নীচে। ভারতীয়-বাংলাদেশি হিসাব কষার আগেই আমাদের গণকবর দেবে প্রকৃতি।