সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকার স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নিয়ে এবার বিদ্রোহ মোদি সরকারের অন্দরে! বিরোধীদের সুরেই সরব হতে শুরু করল বিজেপির জোটশরিকদের একাংশ। এমনকী স্বয়ং নীতীশ কুমারের সংযুক্ত জনতা দল (জেডিইউ) পর্যন্ত। বুধবার সংসদ ভবনে হঠাৎই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বাঁকা লোকসভা কেন্দ্রের জেডিইউ এমপি গিরিধারী যাদব। বলেছেন, ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন বিহারবাসীর উপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিহারের ইতিহাস সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন কিছুই জানে না। কোনও বাস্তব জ্ঞানই নেই। কমিশন বিহারের ইতিহাস কিংবা ভূগোল কিছুই না জেনেই এরকম একটি বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক মাসের মধ্যে সব নথিপত্র দেখাতে হবে, জমা দিতে হবে। এটা কি ছেলেখেলা হচ্ছে?’
গিরিধারী যাদব একাই সরব, তা কিন্তু নয়। এনডিএ জোটের শরিক মহারাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টি অব ইন্ডিয়ার (আরপিআই) সভাপতি রামদাস আটাওয়ালেও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, ‘ভোটার তালিকা রিভিশন ইস্যুতে বিরোধীরা আপত্তি করছে ঠিকই। কিন্তু সেজন্য দিনের পর দিন সংসদের সভা অচল করে রাখা ঠিক নয়। তৃণমূলস্তরে কী চলছে, সেটাও কমিশনকে দেখতে হবে। সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টি রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের অবস্থানও তো মানতে হবে সকলকে।’ আটাওয়ালে যেন বিজেপিকেই কার্যত মনে করিয়েছেন যে, বিরোধীরা যাদের হয়ে কথা বলছে, যাদের নাম বাদ যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে, তারা কি শুধুই ওদের ভোটার নাকি? তারা তো আমাদেরও ভোটার! কারণ, আরপিআই মহারাষ্ট্রের অনগ্রসর শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। আর বিরোধীরা এই ইস্যুতে সবথেকে বেশি যে প্রচার করছে, সেটি হল— নির্বাচন কমিশনের এই তুঘলকি সিদ্ধান্তে সবথেকে বেশি নাম বাদ যাবে অনগ্রসরদের। বিজেপি আর কমিশন মিলেমিশে পিছড়ে বর্গকে ভোটাধিকার থেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে। স্বাভাবিকভাবে সেই কারণে এনডিএ শরিকদের সকলে একে একে উদ্বিগ্ন। এই ইস্যুতে বিজেপি-সঙ্গ, তাদের ভোটব্যাঙ্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে প্রস্তাব দিয়েছিল, নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে আধার, রেশন কার্ডকে মান্যতা দেওয়া যায় কি না, সেটা কমিশন খতিয়ে দেখুক। কিন্তু কমিশন মঙ্গলবারই শীর্ষ আদালতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আধার ও রেশন কার্ড একটি পরিচয়পত্র। ভোট দেওয়ার যোগ্যতা অর্জনকারী নথি নয়। অর্থাৎ নাগরিকত্বের প্রমাণও নয়। এই পরিস্থিতিতে জেডিইউ এমপি গিরিধারী যাদব তুলে ধরেছেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। বলেছেন, ‘অন্য কারও কথা বলার দরকার নেই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই খুব খারাপ। ১০ দিন সময় লেগেছে সব নথিপত্র সংগ্রহ করতে। আমার ছেলে থাকে আমেরিকায়। এক মাসের মধ্যে তার পক্ষে স্বাক্ষর করা কীভাবে সম্ভব? অন্ততপক্ষে ছ’মাস সময় দেওয়া উচিত ছিল।’ তবে পরক্ষণেই তিনি সতর্ক গলায় বলেন, ‘এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত। দল কী বলল না বলল সেটা আমি জানি না। আমি বলব। কারণ, আমি একজন এমপি। সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা আমাকে বলতেই হবে। আমি যদি সত্যি কথা বলতেই না পারি, তাহলে আমি কীসের এমপি?’ গিরিধারীর এই মন্তব্য নিয়ে জলঘোলা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, বাঁকা কেন্দ্রের এমপি নীতীশ কুমারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তিনি হঠাৎ দলের অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে এরকম একটি বিবৃতি দেবেন কেন? তাহলে কি তাঁর মাধ্যমে আসলে নীতীশই বার্তা দিচ্ছেন বিজেপিকে? এই এসআইআর ইস্যুতে নীতীশের সঙ্গে বিজেপির কি তাহলে গোপন দূরত্ব তৈরি হয়েছে?