নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: অভয়া আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সিপিএম, নাকি অভয়ার নিজের পরিবার— ভোটের ময়দানে কারা রাজনৈতিক সুবিধা পাবে, কারা মানুষের সহানুভূতি কুড়াবে, সেই প্রশ্নে তোলপাড় হয়েছে রাজ্য। দু’পক্ষই একে অপরকে কটাক্ষ করেছে নানাভাবে। কার্যত দ্বিধাভক্ত হয়ে পড়েছিল পানিহাটিও। কিন্তু শেষ রায়ে অভয়ার আন্দোলনকারীরা নয়, অভয়ার পরিবারকেই বেছে নিয়েছেন মানুষ। পরিবর্তনের হাওয়া, পরিবারতন্ত্র ও অভয়া ইস্যুতে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে সিপিএম ও তৃণমূল।
পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্র বাম জমানা থেকে তৃণমূলের অন্যতম ঘাঁটি। ১৯৯৬ সালে কংগ্রেস এবং ২০০১ সালে তৃণমূলের টিকিটে জয়লাভ করেছিলেন নির্মল ঘোষ। ২০০৬ সালে সিপিএম প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলেও ২০১১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনিই বিধায়ক ছিলেন পানিহাটিতে। কিন্তু তাঁর এলাকার ডাক্তারি পড়ুয়াকে আর জি কর হাসপাতালে নৃশংস অত্যাচারের পর খুন করা হয়েছিল। ওই ঘটনার পর অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলনে তোলপাড় হয় রাজ্য। নির্মলবাবু সহ এক ঝাঁক তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে প্রমাণ লোপাটে সহযোগিতার অভিযোগ তুলেছিল ছাত্রীর পরিবার। এবার এই কেন্দ্রে বর্ষীয়ান নির্মল ঘোষের ছেলে তথা পানিহাটি পুরসভার কাউন্সিলার তীর্থঙ্কর ঘোষকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। অন্যদিকে, সিপিএম প্রার্থী করেছিল অভয়া আন্দোলনের জেরে জেলে যাওয়া ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির জনপ্রিয় যুব মুখ কলতান দাশগুপ্তকে। কিন্তু, শেষ বেলায় বিজেপি অভয়ার মা রত্না দেবনাথকে প্রার্থী করে সবাইকে চমক দিয়েছিল। রত্নাদেবীর প্রার্থী হওয়া উচিত কি না, এই প্রশ্নে তোলপাড় হয়েছে রাজ্য। প্রশ্ন তুলেছিল সিপিএমও। সেসব প্রশ্ন উড়িয়ে রত্নাদেবী প্রচারে মূলত মেয়ের বিচার সহ সারা রাজ্যের অত্যাচারিত মহিলাদের বিচারের জন্য লড়াইয়ে নেমেছেন বলে জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় তাঁর প্রচারে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা নজরে এসেছিল। তৃণমূল প্রার্থী অভয়া ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে পানিহাটির উন্নয়ন ও বিজেপির মিথ্যাচার নিয়ে প্রচার করেছিলেন। সিপিএম প্রার্থী অভয়ার ন্যায়বিচার, অনুন্নয়ন সহ নানা ইস্যুতে প্রচারে ঝড় তুলেছিলেন।
ভোটের ফলাফলে দেখা গিয়েছে, মানুষ সমস্ত বিতর্ককে দূরে সরিয়ে অভয়ার মা রত্নাদেবীকে আপন করে নিয়েছেন। রত্নাদেবী পেয়েছেন ৮৭,৯৭৭ ভোট। তৃণমূল প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষ পেয়েছেন ৫৯,১৪১ ভোট। রত্নাদেবীর জয়ের ব্যবধান ২৮,৮৩৬ ভোট। সিপিএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত পেয়েছেন ২৪,০৩২ ভোট। অথচ, দু’বছর আগে লোকসভা ভোটে বামেরা এই কেন্দ্রে ৩৫ হাজার ৮৪৯ ভোট পেয়েছিল। কিন্তু এবার তাদের ১১,৮১৭ ভোট কমেছে। অন্যদিকে, দু’বছর আগে তৃণমূল এই কেন্দ্রে পেয়েছিল প্রায় ৭২ হাজার ভোট। এবার তারা প্রায় ১২,৮৫৯ ভোট কম পেয়েছে। বিজেপি সেবার পেয়েছিল প্রায় ৬০ হাজার ভোট। এবার তারা প্রায় ২৮ হাজার ভোট বাড়িয়েছে।
পানিহাটি পুরসভার ২৯টি ওয়ার্ড নিয়ে এই বিধানসভা কেন্দ্র। প্রাক্তন বিধায়ক নির্মলবাবু ও তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষ ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। ওই ওয়ার্ড সহ ২৯টি ওয়ার্ডেই তৃণমূল বিপুল ভোটে পিছিয়ে গিয়েছে। পানিহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান সোমনাথ দে বলেন, ফলাফল বিশ্লেষণ করে হারের কারণ খতিয়ে দেখা হবে। সিপিএম নেতা শুভব্রত চক্রবর্তী বলেন, পানিহাটি তো রাজ্যের বাইরে নয়। পরিবর্তনের হাওয়ায় মানুষ তৃণমূলের বিকল্প হিসাবে বিজেপিকে গ্রহণ করেছে। তাই কিছুটা ভোট কমেছে। বিজেপি নেতা কৌশিক চট্টোপাধ্যায় বলেন, অভয়ার মা রত্না দেবনাথের প্রতি মানুষ সহমর্মিতা ও ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছেন। তার সঙ্গে পানিহাটির পরিবারতন্ত্র, অনুন্নয়ন, দুর্নীতি, খুনের রাজনীতি, সন্ত্রাস সব মিশে গিয়েছে। সেই ঝড়ে পানিহাটি থেকে মুছে গিয়েছে তৃণমূল।