Bartaman Logo
২৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

গালার ব্যবসায় লাভের টাকায় পিতলের রথ গড়িয়ে দিয়েছিলেন বনকাটির জমিদার

কাঁকসা জঙ্গলমহলের প্রাচীন গ্রামীণ জনপদ অযোধ্যা-বনকাটি। একসময় কাঁকসা থানা এলাকার সমগ্র ভূখণ্ডই সেনপাহাড়ী নামে পরিচিত ছিল। বাংলার বিখ্যাত সেন রাজাদের নামেই সেনপাহাড়ী বলা হতো।

গালার ব্যবসায় লাভের টাকায় পিতলের রথ গড়িয়ে দিয়েছিলেন বনকাটির জমিদার
  • ২৭ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, মানকর: কাঁকসা জঙ্গলমহলের প্রাচীন গ্রামীণ জনপদ অযোধ্যা-বনকাটি। একসময় কাঁকসা থানা এলাকার সমগ্র ভূখণ্ডই সেনপাহাড়ী নামে পরিচিত ছিল। বাংলার বিখ্যাত সেন রাজাদের নামেই সেনপাহাড়ী বলা হতো। আবার বন কেটে বসতি স্থাপন হয়েছে, তাই বনকাটি নাম হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। যদিও বন কেটে বসতি স্থাপনের সময়কালের নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। কাঁকসার বনকাটিতে রথের দড়ি টানতে ভিড় হয় বহু মানুষের। জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয় রথযাত্রা।

Advertisement

জানা গিয়েছে, রায়বাড়ির পূর্বপুরুষ ছিলেন মহেশ্বরপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন সেন বংশের কুলপুরোহিত। ওই বংশের রাজা বল্লাল সেনের সময় বনকাটি গ্রামে তিনি আসেন। রায় উপাধি পেয়ে এলাকায় রাজত্ব শুরু করেন। পরিবারের সদস্য কালীদাস রায় বলেন, মহেশ্বরপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় বিখ্যাত তন্ত্রসাধক ছিলেন। পঞ্চমুণ্ডির আসন রয়েছে এখানে। তবে বনকাটির পিতলের রথ খুব বিখ্যাত।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বনকাটি এলাকায় প্রায় ২০০বছর আগে পিতলের রথ তৈরি করে উৎসব শুরু করেন বনকাটির তৎকালীন জমিদার রামপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি গালার ব্যবসা করে প্রভূত অর্থ উপার্জন করেছিলেন। সেই সময় বসুধা থেকে সাতকাহনিয়া হয়ে বনকাটি পর্যন্ত ছিল পলাশের বন। সেই গাছে লাক্ষা পোকার চাষ হতো। বীরভূমের ইলামবাজার তখন গালাশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। শোনা যায়, একদিনের ব্যবসার লাভের টাকা থেকে এই রথ করিয়েছিলেন তিনি। কথিত আছে, রামপ্রসাদ ওড়িশা থেকে শিল্পী নিয়ে এসেছিলেন। তবে ভিন্ন মতে স্থানীয় শিল্পীদের দিয়ে কাজটি হয়েছিল। কারণ টিকরবেতা, আদুরিয়া, অমরপুরে কাঁসা-পিতলের কারিগরদের রমরমা ছিল একসময়। বনকাটির রথটির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। এখানে একটি পিতলের সারথি ও দু’টি পিতলের অশ্ব রয়েছে। রথের চারদিকে খোদাই করা রয়েছে রামায়ন, মহাভারত, পুরাণের বিভিন্ন কাহিনি। দশ ইঞ্চির প্লেট করে চিত্রিত হয়েছে কাহিনি। এছাড়াও সে যুগের অনেক সমাজিক দৃশ্য অঙ্কিত রয়েছে। যেমন সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলাদের ছবি। গরিব ঘরের মেয়ের মাদারির খেলা দেখানো অথবা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ফেরি করছেন এক মহিলা। গবেষক পরেশচন্দ্র দত্ত তাঁর রাঢ় এলাকার পুরাতত্ত্ব গবেষণা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, রথের চারদিকে যে চিত্র রয়েছে তা বিখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসু তাঁর ছাত্রছাত্রীদের এখানে নিয়ে এসে দেখিয়ে গিয়েছেন। দু’বার তিনি এসেছিলেন বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। পিতলের রথ ছাড়াও জগন্নাথদেবেরও বিশেষত্ব রয়েছে। সারা বছর নাড়ুগোপাল বেশে পূজিত হন দেবতা। রথের দিনও ওই বেশই থাকেন। দেবতাকে নিবেদন করা হয় ৫৬ ভোগ।
রথের দিন মন্দির থেকে হাটতলা পর্যন্ত রথ নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে ভক্তদের দর্শনের পর আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয় মন্দিরে। রথ ও উল্টোরথ উপলক্ষ্যে অযোধ্যা হাটতলায় মেলা বসে। কালীদাসবাবু বলেন, এখানের মেলায় জিলিপি বিখ্যাত। বোলপুর, ইলামবাজার, পানাগড়, দুর্গাপুর থেকে বহু মানুষ ভিড় করেন রথযাত্রার দিন। স্থানীয় বাসিন্দা আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক প্রণব ভট্টাচার্য বলেন, বাংলার যে কয়েকটি পিতলের রথ রয়েছে তার মধ্যে বনকাটি রথ প্রাচীনতম। ১২৪২বঙ্গাব্দে এই রথ নির্মিত হয়েছে। পাশের একটি মন্দিরের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে রথ নির্মাণ হয়েছে। পিতলের এই রথ ঐতিহাসিক সম্পদ। এটি সংরক্ষণ করা হলে এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বেঁচে থাকবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ