শোভন চন্দ, কলকাতা: জানবাজার। ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই এই জায়গাটা খুব ব্যস্ত। জমিদার বাড়ির প্রাচীরের গায়ে গজিয়ে উঠেছে নানা ব্যবসা। গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলেই অন্য এক জগৎ। সকালের রোদ সিঁড়ি বেয়ে সবে ছুঁয়েছে ঠাকুর দালান। সেখানে বসে একদৃষ্টিতে কী যেন দেখছিলেন! তারপর মোটা ফ্রেমের চশমা ঠিক করে নিয়ে আবারও কাজে মন দিলেন লালু চিত্রকর। বয়স হয়েছে। তবে আঙুলের টানে তা বোঝার উপায় নেই। চোখ থেকে নাক, নাক থেকে ঠোঁট— জীবন্ত হয়ে উঠছেন রানি রাসমণি বাড়ির মা দুর্গা। না, কোনো ছাঁচ নেই। পুরোটাই হাতের কায়দায়। শ্রাবণের শেষের দিকে ঘর বেঁধে মাটি ধরানো হয়। তারপর দোমাটি। আপাতত হাতে বেশি সময় নেই। তাই একদিকে চলছে মূর্তি গড়ার কাজ। আর অন্যদিকে তুলির টানে দ্রৌপদী, ছিন্নমস্তা সহ নানা পুরাণ কথায় সেজে উঠছে চালচিত্র। লালু ষষ্ঠ প্রজন্ম। সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে মূর্তি গড়ছে তার বাপ-ঠাকুরদারা। একইসঙ্গে রানি রাসমণি বাড়িতে সাড়ম্বরে চলছে মাতৃ আরাধনা। এবার ২৩৬ বছরে পড়ল পুজো। একসময় এখান থেকেই গোটা বাংলায় নারী ক্ষমতায়নের বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল। সখীবেশে মায়ের আরাধনা করেছিলেন রামকৃষ্ণ। পুজোয় এসেছিলেন রামমোহন-বিদ্যাসাগর। ব্রিটিশ দম্ভ বধ করতে এই বাড়িতেই তলোয়ার হাতে ‘মা দুর্গা’ হয়ে উঠেছিলেন রানি রাসমণি।
১৭৯০ সালে পুজোর সূচনা করেন রানি রাসমণির শ্বশুরমশাই প্রীতিরাম দাস (মাড়)। স্বামী বাবু রাজচন্দ্র দাসের মৃত্যুর পর ১৮৩৭ সালে সেই দায়িত্ব নেন রানিমা। একসময় যোগ্য সঙ্গত দেন জামাই মথুরমোহন বিশ্বাসও। রথের দিন কাঠামো পুজো করে শুরু প্রস্তুতি। এখানে মায়ের রং তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ। শোলার সাজে সজ্জিত একচালার প্রতিমার সামনে দুপাশে থাকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদার প্রতিকৃতি। দালানে রানি রাসমণির মূর্তিও রয়েছে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীতে এই বাড়িতে কুমারী পুজো হয়। মাকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। তার বদলে লুচি, ভাজাভুজি, ক্ষীর, দই, মিষ্টি ইত্যাদি নিবেদন করা হয়। ষষ্ঠ প্রজন্ম প্রসূন হাজরার কথায়, সমস্ত রীতি মেনেই পুজো করা হয়। তবে ছাগবলি বন্ধ। কমেছে নৈবেদ্যের পরিমাণ।
সালটা ১৮৬৪। জমিদার বাড়ির পুজোয় তখন কত পুরুষের আনাগোনা। অগত্যা চিকের আড়াল থেকেই পুজো দেখছেন বাড়ির মেয়ে-বউরা। এরইমাঝে শাড়ি পরে চামর দুলিয়ে মাতৃ আরাধনায় মেতে এক ‘মহিলা’। কে ইনি? চমকে গিয়েছিলেন মথুরবাবু। ঠিক তখনই জগদম্বা দেবী বলে ওঠেন, এ যে আমাদের ‘ছোটো ভটচাজ’ (ভট্টাচার্য)। নারীরা যখন চিকের আাড়ালে পুজো দেখতেন তখন সখী বেশে মা দুর্গাকে পুজো করে সেই প্রথা ভেঙে দেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ। একসময় এই বাড়ির পুজোয় এসেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায়। বিধবা বিবাহ প্রচলন, সতীদাহ প্রথা রদ নিয়ে রানি রাসমণির বাড়িতে নানা বৈঠক-আলোচনা হয়েছিল। তৎকালীন বঙ্গদেশে সমাজ সংস্কার ও নবজাগরণের লড়াইয়ে অন্যতম অংশীদার হয়ে উঠেছিলেন রাসমণিও।
একবার ইংরেজ সৈন্যরা কুলদেবতা রঘুনাথ জিউর মন্দিরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তলোয়ার হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন রানিমা। সেকথা আজও জানবাজারের লোকজনের মুখে মুখে ফেরে। বর্তমানে বংশধরদের মধ্যে ভাগ হয়েছে পুজো। তবে নানা প্রতিবন্ধকতা, রীতি-নীতির গণ্ডি পেরিয়ে জগৎজননীর আরাধনা আত্মমর্যাদা, অধিকার ও নারী স্বাধীনতার লড়াইয়ের এক দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।