


ব্রতীন দাস, রাজগঞ্জ: চৈত্রের ঝরা পাতা গড়াচ্ছে পিচঢালা রাস্তায়। কিন্তু গা পোড়ানোর মতো রোদের তেজ নেই। কয়েকদিনের বৃষ্টির জল পেয়ে কচি পাতা উঁকি মারতে শুরু করেছে চা গাছে। ডেঙ্গুয়াঝাড় বাগানের শ্রমিক জিতি মুন্ডার মুখে হাসি। সেকেন্ড ফ্ল্যাশ এগিয়ে আসবে। এবার ভোটের হাওয়া কোনদিকে? প্রশ্ন শুনে মুচকি হেসে জিতির সংক্ষিপ্ত উত্তর, কৃষ্ণই জানেন! রংধামালি হাটে ঝুড়ি-কুলো নিয়ে বসেছেন সুকুমার ভূমিজ। দরদাম চলছে। বিকিকিনির মাঝে তাঁরও প্রায় একই জবাব।
মহাভারতের যুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথি ছিলেন কৃষ্ণ। জয় হয়েছিল পাণ্ডবপক্ষের। রাজগঞ্জের ভোট-যুদ্ধে এবার ‘সোনার মেয়ে’ স্বপ্না বর্মনের রথের সারথী আর এক কৃষ্ণ। এই কৃষ্ণের দেবত্ব শক্তি নেই। কিন্তু ভোটের খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে, অন্তত এমনটাই মনে করেন জিতি কিংবা সুকুমার।
রাজগঞ্জে তৃণমূল কংগ্রেসের মাটি উর্বর। বাম আমলে এখানে ঘাসের উপর জোড়াফুল ফোটান খগেশ্বর রায়। ২০০৯ সালের উপ নির্বাচনে জিতে প্রথম বিধায়ক হন তিনি। এরপর একই কেন্দ্র থেকে জিতেছেন আরও তিনবার। হাতের তালুর মতো নিজের এলাকা চেনেন। এবার প্রার্থী হতে না পারায় কিছুটা অভিমান হলেও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক ফোনেই বরফ গলে জল। সদর্পে ভোটের ময়দান কাঁপাচ্ছেন। স্বপ্নার রথের আর এক সারথী তিনি।
কৃষ্ণ ও খগেশ্বর শুরু থেকে ভালোই সুইং করাচ্ছেন বল। বিরোধীদের নিয়ে প্রশ্ন করতেই খগেশ্বরের টিপ্পনি, আমাদের এখন অবস্থা ‘ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে গাত্রে হল ব্যথা। বিরোধী প্রার্থী নিয়ে আমাদের কোনও মাথাব্যথাই নেই’। সোমবার বিজেপির জলপাইগুড়ি জেলা সভাপতি শ্যামল রায় বলেন, শাসক দল তারকা প্রার্থী দিলেও জয়ের ব্যাপারে আমরা প্রত্যয়ী। প্রার্থী নয়, মানুষ আমাদের প্রতীক দেখে ভোট দেবে। রাজগঞ্জে তৃণমূল কংগ্রেসের উর্বর জমিতে ‘সোনা’ ফলাতে মরিয়া সোনার মেয়ে স্বপ্না। খেলার মাঠে টপকেছেন অনেক হার্ডলস। ২০১৮-এর এশিয়াডে সোনা জিতে উজ্জ্বল করেছেন দেশের মুখ। এবার জীবনের দ্বিতীয় ইনিংসেও ‘চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে নিজেকে দেখতে চান তিনি। সেই লক্ষ্যেই শুরু করেছেন দৌড়। রাজবংশী সমাজের অন্যতম মুখ স্বপ্নার গায়ে মাটির গন্ধ। সদ্য প্রয়াত বাবা ভ্যানরিকশ চালিয়ে তাঁকে পড়াশোনা শিখিয়েছেন। খেলার মাঠে পাঠিয়েছেন। মা চা বাগানের শ্রমিক ছিলেন। কী বলছেন স্বপ্না? বাবা মারা গিয়েছেন। তাই আমি প্রচারে যেতে পারছি না। কর্মী-নেতারা ময়দানে আছেন। তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। জয় নিয়ে আমার কোনও টেনশন নেই। এদিকে সিপিএম প্রার্থী খরেন্দ্রনাথ রায় কৃষি ও চা বলয়েই মন দিয়েছেন প্রচারে।
বেলাকোবা রেলগেট পেরিয়ে একটু এগিয়ে গলি রাস্তায় কালী দত্তের চমচমের দোকান। সেখানে মিষ্টিমুখেই জমে উঠছে আলাপ। কখনোবা চমচমের প্লেটে আছড়ে পড়ছে ভোটের উত্তাপ। তবে মোটের উপর বাসিন্দারা স্বীকার করছেন, রাস্তাঘাট, সেতু, গার্লস স্কুল, নয়া পলিটেকনিক কলেজ- প্রত্যাশা পূরণে রাজগঞ্জে অনেক কাজই হয়েছে।
তবে যন্ত্রণার শেষ নেই বেলাকোবা রেলগেট নিয়ে। দশ মিনিট অন্তর গেট পড়ে। থমকে যায় জনজীবন। গাড়ির লম্বা লাইন পড়ে দু’পাড়ে। সাধারণের এই ভোগান্তি এবারও ভোটের ইস্যু। রেলগেটে উড়ালপুল করার আশ্বাস দিয়ে লোকসভায় ভোট নিয়েও বিজেপি কথা রাখেনি, বলছে তৃণমূল। রাজ্য জমি না দিলে উড়ালপুল হবে কী করে, পালটা যুক্তি দিচ্ছে গেরুয়া শিবির।