


কাজলকান্তি কর্মকার, ঘাটাল: সে সময় ছিল না আধুনিক প্রযুক্তির জৌলুস, না ছিল যাতায়াতের সুগম পথ। বিস্তীর্ণ কৃষিভূমির বুক চিরে জেগে থাকা আলপথই ছিল সাধারণ মানুষের চলাচলের রাস্তা। বর্ষায় সেই পথ যখন মরণফাঁদে পরিণত হত, তখন থমকে যেত জনজীবন। জলপথই ছিল ভরসা, কিন্তু নদীঘাট পর্যন্ত পৌঁছানোর লড়াইটা ছিল করুণ আখ্যান। সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘদিনের সমস্যাকে নিজের হৃদয়ে অনুভব করেছিলেন এক অকুতোভয় নারী। তিনি দাসপুর থানার কেলেগোদা গ্রামের বধূ রাইমণি মাইতি। তাঁরই একক জেদ ও সংকল্পে জন্ম নিয়েছিল এক ঐতিহাসিক যোগসূত্র, যা আজও ‘রাইমণি রোড’ নামে ঘাটাল ও দাসপুরের জনমানসে ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল। যে রাস্তাটি ঘাটাল শহরের কলেজ মোড় থেকে শুরু হয়ে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী মহাবিদ্যালয়ের পশ্চিম দিক দিয়ে নিমতলা-গাদিঘাট-লাওদা-পীরতলা-দাসপুর-শিমুলিয়া-সোনাখালি হয়ে গোপীগঞ্জ পর্যন্ত চলে গিয়েছে।
রাইমণি মাইতির পারিবারিক ইতিহাস ঘেঁটে জানা গিয়েছে, তিনি এক সম্পন্ন কৃষক পরিবারের বধূ ছিলেন। তাঁর শ্বশুরবাড়ির ব্যবসার মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতার তদানীন্তন হগ মার্কেট। ফুলকপির চাষ ও বিক্রিতে মাইতি পরিবারের সুখ্যাতি ছিল। ব্যবসার তাগিদে মাঝেমধ্যেই রাইমণিকে কলকাতায় যাতায়াত করতে হত। গোপীগঞ্জ কিংবা ঘাটালের লঞ্চঘাট ছিল যাতায়াতের মূল রাস্তা। কিন্তু সেই ঘাটে পৌঁছাতে গিয়ে গ্রাম্য আলপথের যে নিদারুণ কষ্ট তিনি সচক্ষে দেখেছিলেন, তা থেকেই তাঁর মনে এক সুদীর্ঘ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা দানা বাঁধে।
ঘাটাল আদালতের প্রবীণ আইনজীবী রজতকান্তি পাঁজার কথায়, ১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গোপীগঞ্জ থেকে ঘাটাল শহর পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার রাস্তা তৈরির কাজ শেষ হয়। মাটির সেই সড়ক একে একে যুক্ত করেছিল মোট ১৮টি গ্রামকে। এই রাস্তা শেষ হয়েছিল ঘাটালের স্টিমার ঘাটে। লোকশ্রুতি, ১৯০৭ সালে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু যখন হাটগেছিয়ায় ইংরেজদের ডাক লুট করেন, সেই ঐতিহাসিক মেঠো পথটিও পরবর্তীকালে এই রাইমণি রোডের অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৩৩ সালে বার্জ সাহেবের উপস্থিতিতেই মহাসমারোহে এই সড়কের উদ্বোধন হয়। সেদিন থেকেই সরকারি নথিতে ও মানচিত্রে এই রাস্তার নাম হয় ‘রাইমণি রোড’।
তবে কেবল রাস্তা নয়, জনসেবায় রাইমণি মাইতির অবদান ছিল বহুমুখী। সড়ক নির্মাণের আগেই ১৯২৪ সালে সোনাখালি বাজারে তিনি একটি দাতব্য চিকিৎসালয় করেছিলেন। তাঁর স্বামী রাধানাথ মাইতির নামাঙ্কিত সেই ‘রাইমণি বোর্ড চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি’-র জীর্ণ ভবন আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। সেখানেই হয়েছে সোনাখালি গ্রামীণ হাসপাতাল।
কালের নিয়মে আজ সেই অখণ্ড রাস্তা হয়তো কিছুটা খণ্ডিত। ওই সময় রূপনারায়ণ নদ ধরেই নৌকায় করে কোলাঘাট হয়ে কলকাতা বা দূরবর্তী স্থানে যেতে হত। ১৯৫৭ সালে ওই নদে ‘পার্থসারথী’ লঞ্চ দুর্ঘটনার পরই যখন ঘাটাল-পাঁশকুড়া সড়ক তৈরির জোরালো দাবি ওঠে তারপরই রাইমণি রোডের গুরুত্বের বিন্যাস বদলায়। আশির দশকে চন্দ্রেশ্বর খাল সংস্কারের সময় এই রাস্তার কিছু অংশ চওড়া হয়।
ঘাটাল পুরসভার ১৬ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে এই রাস্তাটি অপরিহার্য। ঘাটাল পুরসভার চেয়ারম্যান তুহিনকান্তি বেরার ব্যাখ্যায়, রাইমণি রোড আজও গুরুত্ব হারায়নি। সরকারি সহযোগিতায় এই রাস্তার সংস্কারের কাজ নিয়মিত চলে। • নিজস্ব চিত্র