বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: বছর খানেক আগে বুলডোজার চলেছিল রামপুরহাট স্টেশন লাগোয়া চত্বরে। ভেঙে দেওয়া হয়েছিল ঝুপড়ি দোকান, মানুষের একচিলতে আশ্রয়। আবারও একটু একটু করে গুছিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন সকলেই। রাজ্যে পালাবদল হতেই ফের নোটিস। আগামী ২৩ জুনের মধ্যে খালি করে দিতে হবে রেলের জমি। নির্দেশ পেতেই হাহাকার সর্বত্র। সবাই বলছেন—‘এ তো উচ্ছেদের নোটিস নয়, এ আমাদের কাছে মৃত্যু পরোয়ানা।’
রামপুরহাট শহরের প্রায় অর্ধেক রেলের জমি—স্টেশন চত্বর থেকে শুরু করে চাঁদামারি রেলগেট, ছফুঁকো এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত। সেটাই আবার ফাঁকা করার নোটিস ধরিয়েছে রেল।
স্টেশন থেকে কিছুটা গেলেই চায়ের দোকান বৃদ্ধা নমিতা মণ্ডলের। স্বামী ও সন্তানের আকস্মিক মৃত্যুর পর জীবন-যুদ্ধে নামতে হয় তাঁকে। ছোট্ট এই চায়ের দোকানই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নমিতাদেবীর সঙ্গে বিধবা বউমা ও একমাত্র নাতি। পড়াশোনায় নাতি খুব মনযোগী। তাকে শিক্ষিত করে তোলাই মূল লক্ষ্য বৃদ্ধার। চায়ের দোকানের রোজগারে নাতির পড়াশোনা ও তিন পেট চলে। রেলের নোটিস পেয়ে নমিতাদেবীর চোখে জল। বলছিলেন, ‘ নাতিটাকে আর পড়াতে পারব না। বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’ চার নম্বর ওয়ার্ডে রেলের জায়গায় ছিঁটেবেড়া দিয়ে চায়ের দোকান চালান মাঝবয়সী কাবিল শেখ। বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রী ও দুই মেয়ে। তাঁর কথায়, ‘এই দোকানের দৌলতে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোটে। স্ত্রীকে নিয়মিত ওষুধ কিনে দিতে পারি না। দোকানটা চলে গেলে পথে ভিক্ষে করতে হবে।’ এই ওয়ার্ডেই এক কামরার ঘরে সাতজনকে বাস করেন পিন্টু শেখ। কিছুদূরেই ত্রিপল খাটানো তাঁর মুরগির মাংসের দোকান। প্রতিদিন তিন- চারটে করে পোল্ট্রি মুরগি আনেন। সেগুলি কেটে বিক্রি করেন। পিন্টু বলছিলেন, ‘দিনে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আয় হয়। তা দিয়েই সাতজনের কোনোরকমে চলে। মা প্রেসারের রোগী। ঠিকমতো ওষুধও কিনে দিতে পারিনা। বাড়িতে বোন রয়েছে। দোকানটি ভেঙে দিলে আত্নহত্যা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
সমীর পালের গলায়ও বিষাদের সুর। তাঁর ফুলের ব্যবসা। বাড়িতে স্ত্রী রয়েছেন। দুই মেয়ে বিবাহযোগ্য। আগে রেলের জায়গায় অস্থায়ী ঘর বানিয়ে পরিবার নিয়ে থাকতেন। তা ভেঙে দিয়েছে বুলডোজার। এবার দোকান সরিয়ে নেওয়ার নোটিসে দিশেহারা তিনি। বলছিলেন, ‘রেলের উচ্ছেদ নোটিস আমাদের কাছে যেন মৃত্যু পরোয়ানা।’
নমিতাদেবী, পিন্টু, সমীররা উদাহরণমাত্র। রামপুরহাটজুড়েই রুজিরুটি হারানোর আর্তনাদ। ফুটপাত উচ্ছেদ বিরোধী যৌথ মঞ্চের অন্যতম সঞ্জীব মল্লিক রেল ও রাজ্য সরকারকে কটাক্ষের সুরে বলছিলেন, ‘এটাই তো সুনার বাংলা গড়ার অভিযান। এভাবেই ওরা গরিব মানুষদের মেরে তাঁদের উপরেই সুনার বাংলা গড়বে। ওইদিন আমরা বুলডোজারের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’