সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: সোমবার উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে হটন রোড ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। বিশাল পুলিশ বাহিনী এলাকা খালি করাচ্ছে তারপরই বুলডোজার এসে দোকানগুলি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। বুলডোজারের ভয় উপেক্ষা করেই নিজের দোকানের শেষ সম্বল বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা। যা দেখে অনেক সময়ে বুলডোজারের স্টিয়ারিং ধরে থমকে যাচ্ছিলেন কমলেশ মৌর্য। চোখের সামনে দেখছিলেন, তাঁর মতোই দরিদ্র মানুষদের শেষ সম্বল বাঁচানোর লড়াই। পুলিশ প্রশাসন বলছিল চালাও গাড়ি, তবু যেন ফুটপাতবাসীদের কিছুটা বাড়তি সময় দিচ্ছিলেন কমলেশ। তখন যে তাঁর চোখে ভেসে উঠছে নিজের ছেলেমেয়ের কথা।
চোখের জল মুছে কমলেশের দাবি, মাসে ১৩ হাজার টাকা বেতন পাই। এই বেতনটুকু না পেলে আমার সংসার চলবে না। তাই নির্দেশ মতো উচ্ছেদ অভিযান চালাতে হয়। চোখের সামনে দেখি কত গরিবের স্বপ্ন উজাড় হয়ে যাচ্ছে আমার হাত ধরে, আমি নিরুপায়। বুলডোজার না চালালে আমার সংসার কে চালাবে। পরক্ষণেই তিনি বলেন, আমি চাই পুনর্বাসন দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান হোক। তবে আমার কথা কে শুনবে। জানা গিয়েছে, আদতে তিনি উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা। প্রায় তিন দশক ধরে বাংলায় বুলডোজার চালক হিসাবে কাজ করেন। এখন পরিবার নিয়ে আসানসোলের ইসমাইলে থাকেন। তিনি বলেন, বাম আমলেও উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। তবে সেখানে হকারদের জন্য হকার মার্কেট বানানো হতো। এরপরই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই চালক বলেন, কিছু ফুটপাত ব্যবসায়ীও দুষ্টু রয়েছে। তাঁদের নামে বরাদ্দ হওয়ার হকার মার্কেটের দোকান ভাড়ায় দিয়ে রাস্তায় এসে ব্যবসা করছে। সেই দিকটিও দেখতে হবে।
আসানসোলের মতোই বার্নপুরে ইসকো চালাচ্ছে ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযান। জবর দখল হয়ে থাকা পুরনো আবাসন থেকে পার্টি অফিস, ক্লাব, ভাঙা পড়ছে সবকিছুই। এখানে বুলডোজার চালান মহম্মদ কাসার আনসারি। চোখের সামনে দেখছেন মানুষ ভিটেমাটি ছাড়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এই ঘটনা দেখে পাপ বোধ হয়। কিন্তু আমি নিরুপায়। বোনের বিয়ে দিতে হবে। কাজ আমাকে করতেই হবে। তিনি বলেন, বুলডোজারের ঘণ্টায় ভাড়া সাড়ে আটশো টাকা। অথচ বুলডোজার চালকের বেতন ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকার বেশি নয়। মা শেহনাজ খাতুন বলেন, গরিবের সংসার গুড়িয়ে দেওয়ার কাজ করতে হবে না। যখনই বলি বোনের বিয়ে কী করে হবে? মা তখন চুপ করে যায়। আমরাও গরিব, আমাদের হাত দিয়েই গরিবকে সর্বস্বান্ত করা হচ্ছে। আমরা চাই পুনর্বাসন দিয়েই উচ্ছেদ অভিযান হোক।
হটন রোডের উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে শহরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শহরের বিশিষ্ট সমাজ কর্মী থেকে শিক্ষক, উচ্ছেদ অভিযানের সমর্থন করলেও তাঁদের পরামর্শ পুনর্বাসন দেওয়ার বিষয়টি মানবিকতার সঙ্গে দেখা হোক। মঙ্গলবারও হটন রোড চত্বরে চাপা কান্নার রোল। সীতারামপুর থেকে মহম্মদ শামিম এখানে এসে লটারি বিক্রি করতেন। উচ্ছেদের পরের দিনও তিনি এসেছেন। তিনি বলেন, বুঝতে পারছি না কি করব। আমাদের অনুরোধ সরকার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিক। মহম্মদ সারাফৎ কুরেশি বলেন, দাদুর আমল থেকে এখানে ব্যবসা করছি। বাবা ও তিনভাই মিলে ব্যবসা করতাম। পরিবারের ন’জন সদস্য কী ভাবে জীবন ধারণ করবে এখন সেটাই চিন্তার। - নিজস্ব চিত্র