মানুষের সহজাত জীবনবোধ, সংগ্রাম, বিনোদনের হাজারও উপাদান যুগ যুগ ধরে বাংলা লোকসংস্কৃতির অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই তালিকায় বিশেষ উল্লেখযোগ্য লোকনৃত্য রায়বেঁশে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, অবিভক্ত বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ জেলায় এই নৃত্যের প্রচলন হয় প্রায় ১৭৫ বছর আগে। তবে বিভিন্ন সময়ে এর আঙ্গিকে নানা পরিবর্তন এসেছে। এখন যে রায়বেঁশে নৃত্য আমরা দেখি, ব্রতচারী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ গুরুসদয় দত্তের হাত ধরেই তার প্রচলন ও প্রসার বলে মত গবেষকদের। রায়বেঁশে নৃত্য মূলত বীররসের পুরুষালি প্রকাশ। এই নৃত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল যুদ্ধের আঙ্গিকে পৌরুষ প্রদর্শন। নানারকম মার্শাল আর্ট ও শারীরিক কসরৎ দেখা যায় নৃত্যশৈলীতে। কখনও নর্তকরা বর্ষা নিক্ষেপের ভঙ্গি করেন, কখনও তলোয়ার চালনার কায়দা দেখানো হয় হাত ও শরীরের নানা ভঙ্গিতে। নাচের মধ্যেই যুদ্ধের মতো দু’পক্ষ মুখোমুখি হয়। কোনও অস্ত্র ছাড়াই নৃত্যশিল্পীরা যুদ্ধের আবহ রচনা করেন। এছাড়া, শারীরিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কখনও নৌকা, ঘোড়া বা হাতির আদল রচনা করেন শিল্পীরা। এই নাচের জন্য কোনও গান বা ছন্দে বলা কোনও বাণী নেই। তবে ঢোল ও করতালের ব্যবহার আছে। সেই সঙ্গে শিল্পীরা ডান পায়ে ঘুঙুর পরেন। এই তিনের সমন্বয়ে একটা তাল ও ছন্দ তৈরি হয়। রণহুঙ্কারের মতো করে নৃত্যশিল্পীরা মুখে নানারকম শব্দ করেন। গত শতাব্দীর তিনের দশকে গুরুসদয় দত্ত বীরভূমের নানুর থানার চারকোল গ্রামের রামপদ প্রামাণিক, গোবর্ধন প্রামাণিকদের মতো শিল্পীদের সংগঠিত করে এই লোকনৃত্যের প্রচার শুরু করেছিলেন। তারও অনেক আগে থেকে অবশ্য রায়বেঁশের সূত্রপাত। জমিদার, ভূস্বামীদের লেঠেল বাহিনীতে যাঁরা কাজ করতেন, জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ায় তাঁরা কর্মহীন হয়ে পড়েন। তখন বিয়ের অনুষ্ঠানে, বড়লোকেদের মনোরঞ্জনের জন্য লাঠি হাতে নিয়ে নানা কসরৎ দেখাতে শুরু করেন লেঠেলরা। সেটাই দিনে দিনে পরিচিত হয় রায়বেঁশে নৃত্য হিসেবে। প্রযুক্তির যুগে জনপ্রিয়তা কমলেও বাংলা থেকে আজও লুপ্ত হয়ে যায়নি রায়বেঁশে। পূর্ব বর্ধমানের শীতেন্দু চক্রবর্তী বিদেশে রায়বেঁশে নৃত্য পরিবেশন করে এসেছেন। চারকোল গ্রামের মাধব প্রামাণিকও একজন প্রথিতযশা রায়বেঁশে শিল্পী।



