Bartaman Logo
২৬ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

আবাসনের কোয়ার্টার বণ্টন দুর্নীতি, যোগ ‘মক্ষীরানি’ পিঙ্কির

স্বামী শেখ খালিদ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন যুবক। জামুড়িয়ার রেলবস্তির একটি ছোট্ট ঘরে স্বামী আর দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস সায়েরা বিবি ওরফে পিঙ্কির।

আবাসনের কোয়ার্টার বণ্টন দুর্নীতি, যোগ ‘মক্ষীরানি’ পিঙ্কির
  • ১৫ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: স্বামী শেখ খালিদ বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন যুবক। জামুড়িয়ার রেলবস্তির একটি ছোট্ট ঘরে স্বামী আর দুই মেয়েকে নিয়ে বসবাস সায়েরা বিবি ওরফে পিঙ্কির। করতেন পরিচারিকার কাজ। রেলের উচ্ছেদ অভিযানে পিঙ্কিদের ঝুপড়ি ভাঙা পড়ে। গোটা পরিবার নিয়ে আতান্তরে পড়ে সে। ঠাঁই নেয় পথের ধারে। এখান থেকেই পিঙ্কির জীবনের চাকা গড়ায় অন্যদিকে। দালাল চক্রের হাত ধরে আসানসোলের ডামরায় পুরসভার তৈরি আবাসনে থাকার ব্যবস্থা করে সে। 

Advertisement

তারপর থেকেই শুরু পিঙ্কির উত্থান। মিষ্টি কথা বলায় পটু সে। খুব কম সময়ে নজরে পড়ে যায় আবাসন দুর্নীতির মাথাদের। পিঙ্কিকেই তারা বানিয়ে ফেলে এজেন্ট। অতঃপর, আসানসোল পুরসভার ওই আবাসন প্রকল্পে বাড়ি পেতে গেলে পিঙ্কির শরণাপন্ন হতে হতো উপভোক্তাদের। পিঙ্কির কাজ ছিল চক্রের মাথাদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। আবাসনের ফ্ল্যাট বণ্টনে বেনিয়ম করে মাথারা যে টাকা পেত, তার একটা ভাগ পেতে থাকে পিঙ্কিও। শুধু অর্থ নয়, পিঙ্কিই হয়ে ওঠে সরকারি বৃহৎ আবাসন প্রকল্পটির ‘রানি’। সে চাইলেই মিলবে কোয়ার্টারে ঠাঁই। না চাইলে সেখানে থাকা যাবে না। বাধ্য হয়েই আবাসিকরাও তোয়াজ করে চলতে থাকে পিঙ্কিকে। ২০৮টি কোয়ার্টার বিশিষ্ট  বিশাল আবাসন প্রকল্পে এক একটি ফ্ল্যাট একাধিক জনকে বিক্রি করতে থাকে পিঙ্কি। পূর্বের মালিক এসে যখন দেখে অন্যজন্যকে পিঙ্কি তাঁর কোয়ার্টার নতুন করে বিক্রি করে দিয়েছে। পিঙ্কি তখন তাঁর জন্য বিকল্প কোয়ার্টারের ব্যবস্থা করে দিত। এভাবেই বিপুল টাকা তুলতে থাকে সে। পুরসভার আবাসনে কোয়ার্টার বণ্টনে এই কেলেঙ্কারির পাশাপাশি আরও একটি উপায়ে আয়ের বহর বাড়াতে শুরু করে পিঙ্কি। ওই আবাসন প্রকল্পের মধ্যে আস্ত একটা যৌনপল্লি গড়ে তুলতে সক্রিয় হয় দালালচক্র। সেখানেও বিপুল টাকার হাতছানি। জানা গিয়েছে, আবাসন চত্বরে মদের আসর বসানো শুরু করে পিঙ্কি ও তার শাগরেদরা। নেশাড়ুরা সেখানে যাতায়াত শুরু করে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ধীরে ধীরে ফাঁকা কোয়ার্টারগুলিতে দেহ ব্যবসা শুরু হয়। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন অপরাধ করে অনেকে সেখানে আত্মগোপন করতে আসে। লেনদেনের খেলা চলে। আবার বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কে জড়ানো লোকেরা জেনে যান, টাকা দিলেই কোয়ার্টারে থাকার ব্যবস্থা করে দেয় পিঙ্কি। তাই দিনের পর দিন বহিরাগত লোকজনের ভিড় জমতে থাকে সরকারি আবাসনগুলিতে। স্থানীয় বাহুবলীরা এই কারবার থেকে সুবিধা পেয়ে অপকর্মকে সমর্থন করা শুরু করে। তাদের দৌলতে আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে পিঙ্কি। আবাসিকদের ছেলে-মেয়েদের পড়ার পরিবেশ লাটে উঠে। অনেকে প্রতিবাদও করেছিলেন। কিন্তু পিঙ্কির কারবারে রাশ টানতে পারেননি। অভিযোগ, কাউন্সিলার থেকে তৃণমূল নেতাদের কাছে এনিয়ে অভিযোগ করলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। পুলিশ, প্রশাসনও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সরকার বদলের পর স্থানীয় মানুষ বিজেপি নেতাদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে পিঙ্কি ও তার স্বামী প্রথমে হুমকি দেয়। পরে মানুষের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। আবাসনের কোয়ার্টার বিক্রির বেনিয়ম নিয়ে সরব হন। তারপরই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ গ্রেপ্তার করে পিঙ্কি ও তাঁর স্বামীকে। তাদের মেয়ে রোজি ও জন্নত খাতুন বলেন, ‘এখন সব দোষই মা ও বাবার নামে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আরও অনেকে এইসব কারবার চালাতেন।’  আবাসিক ধনঞ্জয় মিশ্র, দীপা শর্মারা বলছিলেন, ‘আমরা প্রতিবাদ করলে আমাদের উপরই চড়াও হত দুষ্কৃতীরা।’ বিজেপি বুথ সভাপতি সংযোগকুমার সিং বলেন, ‘দুঃস্থ, গরিব মানুষের আবাসনে থাকার ব্যবস্থা হবে। কোনো দুষ্টু চক্রের মাথার এখানে ঠাঁই হবে না।’  ধৃত অভিযুক্ত মহিলা।-নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ