আনন্দ সাহা লালবাগ
আনন্দ সাহা লালবাগ
মুর্শিদাবাদের প্রাচীন পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম নবগ্রাম থানার পাশলা গ্রামের রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো। এই পুজোর প্রধান বৈশিষ্ট্য, একই মণ্ডপের ছাদের নীচে তিনটি বেদিতে ত্রয়ী দুর্গার আরাধনা। উমা এখানে দশভূজা নন। ব্যাঘ্ররূপী সিংহের উপর অধিষ্ঠিতা চতুর্ভূজা দেবী অসুর নিধন করছেন। তবে, এই পুজো রায়চৌধুরী পরিবারের কোনও পূর্বপুরুষ শুরু করেননি। গ্রামের প্রবীণ সদস্যরা জানান, এখন যেখানে দুর্গা মন্দির রয়েছে, আগে সেটি জঙ্গলে ঘেরা উঁচু ভূমি বা ঢিবি ছিল। প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে এক সন্ন্যাসিনী গ্রামে আসেন। জঙ্গলে ঘেরা উঁচু ঢিবিতে পঞ্চমুন্ডি আসন স্থাপন করে সাধনায় রত হন এবং সিদ্ধিলাভ করেন। এরপর সিদ্ধা সন্ন্যাসিনী পঞ্চমুন্ডি আসনে ঘট স্থাপন করে দশভূজার আরাধনা শুরু করেন। বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনীকে গ্রামবাসীরা বুড়িমা বলে ডাকতেন। তাই সন্ন্যাসিনীর প্রতিষ্ঠিত এবং পূজিত দুর্গা তখন থেকেই বুড়িমা নামে পরিচিতি লাভ করে। সন্ন্যাসিনীর মৃত্যুর আগে পাশলার জমিদার মথুরানাথ রায়চৌধুরীকে পুজো চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সন্ন্যাসিনীর নির্দেশ মতো জমিদার মথুরানাথ পুজো চালিয়ে যেতে থাকেন। তবে সেই সময়ে ঘট পুজো হতো, মূর্তি পুজো হতো না। শোনা যায়, পরবর্তী সময়ে জমিদার পরিবারের এক সদস্যকে মূর্তি গড়ে পুজো করার নির্দেশ দেন বুড়িমা। সেই থেকে মূর্তি পুজো শুরু হয়। মূর্তি পুজো শুরুর বেশ কয়েক বছর পরে পুজোর স্বত্বাধিকার নিয়ে জমিদার পরিবারের দুই শরিক গিরিশ রায়চৌধুরী ও শ্রীশচন্দ্র রায়চৌধুরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব হওয়ায় দুই শরিক একই মণ্ডপের ছাদের নীচে মূল বেদির ডান দিকে আরও দু’টি বেদী নির্মাণ করে দুর্গাপুজো শুরু করেন।
প্রাচীন রীতি মেনে রথের দিন দেবীর কাঠামোয় মাটির প্রলেপ দিয়ে পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ে। তারপর থেকে মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। ষষ্ঠীর দিন সকালে তিনটি প্রতিমাকে তিনটি বেদীতে স্থাপন করা হয়। এরপর গ্রামের পুকুর থেকে তিনজন পুরোহিত তিনটি ঢাক সহযোগে তিনটি ঘট ভরে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিন দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন। রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ির পুজোয় অন্নভোগ হয় না। লুচি, ফল ও মিষ্টান্ন সহযোগে তিন দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। ষষ্ঠী, সপ্তমী, সন্ধিপুজো এবং নবমীতে ছাগ বলি দেওয়া হয়। পাশলা গ্রামের রায়চৌধুরী জমিদার পরিবারের তিন দুর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীরা উৎসবে মেতে ওঠে। মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত সহ মালদা, নদীয়া ও বীরভূম জেলা থেকেও বহু মানুষ পুজোর চারদিন পাশলা গ্রামে ভিড় জমান। দশমীর সকালে সিঁদুর খেলা হয়। জমিদার পরিবারের মহিলাদের সঙ্গে গ্রামের মহিলারা সিঁদুর খেলায় যোগ দেন। ওইদিন বিকেলে গ্রামে জমিদার পরিবারের দিঘিতে তিনটি দুর্গাকে ঢাকঢোল সহযোগে নিরঞ্জন দেওয়া হয়।