নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যের নির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধি আর জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র ইস্যু করতে পারবেন না। বৃহস্পতিবার সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। এর কারণ, সীমাহীন দুর্নীতি। যে অভিযোগ ব্যাপকহারে উঠে এসেছিল এসআইআর পর্বেই। ঘোষণা হল, এবার থেকে সরকারি আধিকারিক ছাড়া কেউ বার্থ বা ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করতে পারবেন না। পাশাপাশি পুনর্যাচাই হবে ১৯৯৭ সাল থেকে পঞ্চায়েত ও ২০০০ সাল থেকে পুরসভা মারফত জারি হওয়া জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্রও। একদিকে পঞ্চায়েত প্রধান বা পুরসভার চেয়ারম্যানদের থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া, আর অন্যদিকে একের পর এক পঞ্চায়েত ও পুর দপ্তরে অভিযান। বৃহস্পতিবার এটাই ছিল রাজ্যে হুলুস্থুল ফেলে দেওয়ার মতো চিত্র। প্রতিটি গ্রাম, পুরসভার বরো অফিস এমনকি শ্মশানেও চলল হানাদারি। সব তথ্য মিলিয়ে দেখেই এরপর চিহ্নিত করা হবে ভুয়ো জন্ম শংসাপত্র। সরকারি সুবিধা থেকে বাদ যাবে ভুয়ো নাম এবং নিশ্চিত করা হবে জড়িতদের শাস্তি।
এদিন নবান্নে স্বরাষ্ট্রসচিব, স্বাস্থ্যসচিব, তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব, ডিজি, কলকাতা পুলিশের সিপিকে সঙ্গে নিয়ে রাজ্যের এই পদক্ষেপ ঘোষণা করেন মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল। তিনি বলেন, ‘আধার, পাসপোর্ট, স্কুলে ভরতি, ভোটার তালিকায় নাম তোলা, সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন, রেশন কার্ড প্রদানের মূল ভিত্তিই হল জন্ম শংসাপত্র। এমনকি নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ীও বার্থ সার্টিফিকেটের গুরুত্ব অপরিসীম। এসআইআরের সময়ে প্রচুর ভুয়ো সার্টিফিকেট ইস্যু হয়েছে। ডিজিকে এসআইবিও এক রিপোর্ট দিয়েছে। আমরা ৪৬ হাজার ৯৯৮টি ‘ডিলেড’ বার্থ সার্টিফিকেট প্রাথমিকভাবে যাচাই করিয়েছি। তার মধ্যে ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ হাজার ৩৯০টি ভুয়ো পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও ইতিমধ্যে ডিজিটাইজ হয়ে যাওয়া ১১ লক্ষ ২৪ হাজার শংসাপত্রের মধ্যে ভুয়ো মিলেছে ১ লক্ষ ৮০ হাজার। এই পরিস্থিতিতে জন্ম শংসাপত্রের স্বচ্ছ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতেই ব্যাপক হারে এই অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
১৯৯৭ সালে পঞ্চায়েত প্রধান এবং ২০০০ সালে পুরসভার মেয়র বা চেয়ারম্যানদের হাতে জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্র প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়। তার আগে এই দায়িত্বে ছিলেন সরকারি আধিকারিকরাই। জনপ্রতিনিধিদের একাংশ এমন ক্ষমতা ‘রাজনৈতিক ফায়দা’ তুলতে ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ। তাই ফের সরকারি অফিসারদের উপর ভরসা রাখল নবান্ন। এই প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রও দিয়ে দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আপাতত পঞ্চায়েত ও পুরসভা ধরে জেলাশাসকরা ঠিক করে দেবেন, কোন আধিকারিক দায়িত্বে থাকবেন। শীঘ্রই স্বাস্থ্যদপ্তর কেন্দ্রীয়ভাবে বিজ্ঞপ্তি জারি করবে।
দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালে ১ লক্ষ ২১ হাজার ৪৫৩টি জন্ম শংসাপত্র প্রদান হয়েছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ লক্ষ ৮১ হাজার এবং ১০ লক্ষ ৫০ হাজারে। বিগত তিন বছরে অস্বাভাবিকভাবে জন্ম শংসাপত্র প্রদান বৃদ্ধির এই পরিসংখ্যান কপালে ভাঁজ ফেলেছে সরকারের। মুখ্যসচিব বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য নির্ভুল, স্বচ্ছ তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা। আগামী দিনে এই তথ্য ভাণ্ডারের সঙ্গে আবেদনকারীর আবেদন মিলিয়ে দেখে তবেই সরকারি পরিষেবা প্রদান করা হবে।’ ডিজিটাইজেশন শেষ হওয়ার পর সেই তথ্য ধরে বাড়ি বাড়ি যাচাই হবে। যাঁর কাছে শংসাপত্র নেই, তাঁর শুনানি হবে। একইসঙ্গে সমীক্ষায় পাওয়া ভুয়ো সার্টিফিকেট সংক্রান্ত তথ্য পাঠানো হবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং ফরেন রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসে (এফআরআরও)। সে ক্ষেত্রে কোনো ‘অবৈধ বিদেশি নাগরিক’কে চিহ্নিত করে ‘ডিপোর্ট’ করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তথ্য ভাণ্ডার।