Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬

প্রয়াত তবলা সম্রাট জাকির হোসেন

প্রয়াত তবলা সম্রাট জাকির হোসেন
  • ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: তখন তাঁর বয়স ১৪ বা ১৫ বছর। ট্রেনে যাতায়াত করতে হতো। বসার জায়গা পেতেন না হামেশাই। সঙ্গে থাকত ‘চিরকালীন সঙ্গী’ তবলা। খবরের কাগজ পেতে নিতেন কামরায়। সেখানেই তবলাকে জড়িয়ে ঘুমোতেন। অন্য কারও পা যাতে ‘প্রাণাধিক প্রিয়’ বাদ্যযন্ত্রে না লাগে, সে জন্য এই ব্যবস্থা। সেই বাদ্যযন্ত্রকে ফেলে রেখেই সুরলোকের উদ্দেশে পাড়ি দিলেন পাঞ্জাব ঘরানার শিল্পী জাকির হুসেন। সোমবার ভোররাতে। ৭৩ বছর বয়সে। আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোর এক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে। ফুসফুসের জটিল রোগে দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন। রক্তচাপজনিত সমস্যা, হৃদযন্ত্রেও জটিলতা ছিল। রাখা হয়েছিল ভেন্টিলেশনে। সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে শিল্পী পাড়ি দিলেন ‘না ফেরা’র দেশে। মিলল না সম-ফাঁকের হিসেব। হয়তো প্রথমবার।   
Advertisement
এই হিসেব কষা শুরু হয়েছিল শৈশবে, মাত্র তিন বছর বয়সে। সাত বছর বয়স থেকে মঞ্চে একক অনুষ্ঠানের সফর শুরু। উস্তাদ আল্লারাখার বড় পুত্র জাকির জন্মের পর থেকেই শুনতেন তালবাদ্য। জন্ম ১৯৫১ সালের ৯ মার্চ, মুম্বইয়ে। বাবা প্রথম কোলে নিয়েই তাঁর কানে শুনিয়েছিলেন তবলার বোলবাণী। মা বাভি বেগম অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, প্রার্থনা মন্ত্রের পরিবর্তে এগুলি কী বলছেন! হেসে শিল্পী আল্লারাখা জবাব দেন, ‘এই তো আমার প্রার্থনা।’ তবলার স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরিতে তাঁর অবদান ভারতীয় সঙ্গীত জগৎ ভুলবে না কখনও। রবিবার সন্ধ্যায় তাঁর গুরুতর অসুস্থতার খবরে বিশ্বের সঙ্গীতানুরাগীরা মুষড়ে পড়েন। রটে যায় শিল্পীর ভুয়ো মৃত্যুসংবাদ। ভক্তরা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। বোন খুরশিদ আউলিয়া ও তাঁর স্বামী আয়ুব আউলিয়া গভীর রাতে জানিয়েছিলেন, শিল্পী লড়াই করছেন প্রতিনিয়ত। সোমবার ভোররাতে সেই প্রার্থনাকে সঙ্গী করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন উস্তাদ জাকির হুসেন। এদিনই কলকাতার নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠান করার কথা ছিল তাঁর। 
প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর মৃত্যুতে শোকবিহ্বল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। লিখেছেন, ‘ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তাঁর অতুলনীয় ছন্দে লক্ষ লক্ষ মানুষকে মুগ্ধ করে তবলাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চে।’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শোকবার্তা, ‘সর্বকালের শ্রেষ্ঠ তবলাবাদক উস্তাদ জাকির হুসেনের মৃত্যুতে শোকাহত। দেশের ও তাঁর অসংখ্য অনুরাগীদের জন্য চরম ক্ষতি।’             
কিংবদন্তি শিল্পী আমজাদ আলি খান বলেন, ‘ভাষা হারিয়েছি। জাকির ভাইয়ের প্রয়াণ সংবাদে আমি মর্মাহত। বিশ্বের সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে তিনি একজন।’  
পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উস্তাদ আমজাদ আলি খানের মতো বহু শিল্পীর সঙ্গে সঙ্গত করেছেন জাকির হুসেন। পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার সঙ্গে তাঁর যুগলবন্দিতে মুগ্ধ হয়েছে গোটা বিশ্ব। এ বছর তাঁর ব্যান্ড ‘শক্তি’র ‘দিস মোমেন্ট’ অ্যালবামটি ‘বেস্ট গ্লোবাল মিউজিক অ্যালবাম’ হিসেবে গ্র্যামি পুরস্কার জিতে নেয়। মোট পাঁচবার এই পুরস্কার জিতেছেন তিনি। আর এবার এক রাতে তিন-তিনটি গ্র্যামি—এই কৃতিত্ব আর কোনও ভারতীয়ের নেই। পেয়েছেন পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণের মতো পুরস্কারও। জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কত্থকশিল্পী আন্তোনিয়া মিনেকোলাকে। উস্তাদজির ম্যানেজারের ভূমিকাও সামলেছিলেন তিনি। ভিনধর্মী বিয়ে মেনে নিতে পারেননি জাকিরের মা। রক্ষাকর্তা হয়েছিলেন বাবা আল্লারাখা। স্ত্রীকে বুঝিয়েছিলেন। পরবর্তীতে দু’জনের দূরত্ব কমেছিল। 
কেবল তবলা বাদক হিসেবে আবদ্ধ রাখেননি নিজের পরিচয়। ১৯৯৮ সালে ‘সাজ’ ছবিতে আর ডি বর্মনের ভূমিকায় দেখা যায় তাঁকে। এ ছবির সুরকারও তিনি। এছাড়াও বেশ কিছু সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে তাঁকে দেখা গিয়েছিল। অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এও সামলেছেন সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব। চলতি বছরেই মুক্তি পেয়েছিল তাঁর অভিনীত শেষ ‘হলিউড’ ছবি ‘মাঙ্কি ম্যান’।
সম্পর্কিত সংবাদ