Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬

প্রয়াত মনমোহন, প্রকৃত সংস্কারক, উদার অর্থনীতির রূপকার

প্রয়াত মনমোহন, প্রকৃত সংস্কারক, উদার অর্থনীতির রূপকার
  • ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
নয়াদিল্লি: বাড়ির উঠোনে বসে পড়াশোনা করছিল ছেলেটি। ওই উঠোনেরই এক কোণে গোরু-মোষের পরিচর্যা করছিলেন বাবা গুরমুখ সিং। কাজ করতে করতেই ডাক দিলেন, ‘মোহনা...! গোবর-চোনা মেখে রাখা বালতিটা আমার কাছে এনে দে তো।’ বইয়ের গভীরে ঢুকে যাওয়া ছেলেটির কানে ঢোকেনি বাবার ডাক। তিন-চারবার ডাকের পরও বইয়ের পাতা থেকে চোখ ওঠেনি সেই বালকের। শেষমেশ বিশুদ্ধ পাঞ্জাবি ভাষায় খিঁচিয়ে উঠে গুরমুখ সিং ছেলেকে বলেছিলেন, ‘কী এত পড়াশোনা করছিস? বড় হয়ে প্রধানমন্ত্রী হবি নাকি?’ গুরমুখ সিং জানতেন না, তাঁর এই ছেলে সত্যিই একদিন প্রধানমন্ত্রী হবে। শুধু তাই নয়, সেই ‘মোহনা’ ভারতের অর্থনীতিকে দেবে নতুন রূপ। হয়ে উঠবে প্রকৃত সংস্কারক। শুরু করবে নতুন যুগের। অথচ, থাকবে না তাঁর কোনও মার্কেটিং প্যাকেজ। নিঃশব্দে কাজ করে যাবেন। লো-প্রোফাইল, সেই ‘অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ ইহলোক ত্যাগও করলেন প্রচারের বাইরে থেকেই। রাত ৮টা ৬ মিনিটে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হলেন দিল্লি এইমসে। আর ৯টা ৫১ মিনিটে জানা গেল, প্রয়াত মনমোহন সিং। সূত্রের খবর, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে ৭ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করবে কেন্দ্র। আজ, শুক্রবার পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।
Advertisement
অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশ। সেখানকারই গাহ গ্রামে জন্ম হয়েছিল মনমোহন সিংয়ের। ১৯৩২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। দেশভাগের পর চলে আসেন ভারতে। ১৯৫৪ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। আর তার তিন বছর পর লন্ডনের কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর। একের পর এক পালক এরপর জুড়েছে তাঁর মুকুটে। ১৯৬২ সালে অক্সফোর্ড থেকে ডি ফিল। তখনই তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করে দিয়েছেন। ১৯৬৬ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত রাষ্ট্রসঙ্ঘের ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের হয়ে কাজ। আর সাতের দশকের শুরুতে দেশে ফিরে দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্সে অধ্যাপনা শুরু। পড়াতেন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডস। ‘হীরে’ চিনতে ভুল হয়নি ইন্দিরা-ঘনিষ্ঠ সাংসদ তথা বৈদেশিক বাণিজ্য-মন্ত্রী ললিত নারায়ণ মিশ্রর। তিনিই মন্ত্রকের পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োগ করেন মনমোহনকে। তারপর একে একে অর্থমন্ত্রকের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, অর্থসচিব এবং যোজনা কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৮২ সালেই ইন্দিরা সরকারের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করেন। মেয়াদ শেষে মনমোহন চলে যান সুইজারল্যান্ড। যোগ দেন জেনিভার ইকনমিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সাউথ কমিশনের সেক্রেটারি জেনারেল পদে। দেশে ফেরেন ১৯৯০-এর নভেম্বরে। প্রথমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখরের আর্থিক উপদেষ্টা, আর তারপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান। চিত্রনাট্যে টুইস্ট ওই বছরেরই জুন মাসে। প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি গেলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। বললেন, ‘আপনাকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে হবে।’ ভারত বোধহয় ওই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষাতেই ছিল। জন্ম নিল রাও-মনমোহন মডেল। দেশে প্রবেশ করল উদার অর্থনীতি। সেই ছিল নতুন ভারত। 
বাজপেয়ি জমানার অবসানের পর ইউপিএ যখন ক্ষমতায় এল, রাজনৈতিক মহল সোনিয়া গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের বিষয়ে নিশ্চিতই ছিল। কিন্তু না। সবাইকে চমকে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে ঘোষণা হয়েছিল মনমোহনের নাম। ২০০৪ থেকে ’১৪—দশ বছর দেশের প্রশাসনিক প্রধানের পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন তিনি। আর সেইসঙ্গে ভারত দেখেছে একের পর এক সামাজিক সংস্কার। তথ্য জানার অধিকার আইন, ১০০ দিনের কাজ, শিক্ষার অধিকার, খাদ্য সুরক্ষা বিল... মনমোহন জমানায় জনমোহিনী পদক্ষেপ ছিল অন্তহীন। কৃষিঋণ মকুব করেছেন তিনি। বিশ্বজুড়ে চরম মন্দার সময়ও আগলে রেখেছেন দেশের অর্থনীতিকে। অনড় অবস্থান বজায় রেখে পরমাণু চুক্তিও সম্পন্ন করেন মনমোহন সিং।
সংসদীয় রাজনীতিতে বরাবরই তিনি ছিলেন রাজ্যসভার সদস্য। চলতি বছরের এপ্রিলে অবসর নেন এই পদ্মবিভূষণ ব্যক্তিত্ব। শীর্ষপদে থাকাকালীন বহুবার অসম্মানিত হয়েছেন। শুনতে হয়েছে ‘সোনিয়ার পুতুল’ কিংবা ‘মৌন মোহন’-এর মতো কটাক্ষ। তাও সৌজন্যের গণ্ডি পেরননি তিনি। ৯২ বছর বয়সে... শেষদিন পর্যন্তও না। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর বলেছিলেন, ‘আজ আমাকে মিডিয়া সুবিচার দেয়নি। একদিন ইতিহাস নিশ্চয়ই দেবে।’ 
বিশ্বাস ছিল তাঁর ইতিহাসে। আর ইতিহাসের? মনমোহন সিংয়ের কর্মকাণ্ডে।
সম্পর্কিত সংবাদ