কী কুম্ভকর্ণ রে বাবা! ঘুমকাতুরেদের এমন ঠাট্টা মাঝেমধ্যেই সহ্য করতে হয়। রামায়ণের চরিত্র কুম্ভকর্ণ নাকি টানা ছ’মাস ঘুমোতেন। আর তারপর এক মাস জেগে থেকে ফের নিদ্রা। লঙ্কাধিপতি রাবণের ভাইয়ের এই কাহিনি তো সবারই জানা। প্রাণীকুলেও এমন অনেকেই রয়েছে, যারা কুম্ভকর্ণকে কিছুটা লড়াইয়ে ফেলে দিতে পারে। শীতকাল এলে সাপ-ব্যাঙের মতো প্রাণীরা লম্বা ঘুম দেয়। কোনও গর্তে বা গাছের কোটরে গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকে। একেই বলে ‘শীতঘুম’। ইংরেজিতে হাইবারনেশন। ছোট্ট বন্ধুরা, একথা হয়তো তোমাদের অজানা নয়। তবে জানো কি, শুধু শীতেই নয়, প্রবল গ্রীষ্মকালটাও অনেক প্রাণী ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। এই ঘুমকে বলা হয় গ্রীষ্মনিদ্রা বা অ্যাস্টিভেশন। মেরুদণ্ডী ও অমেরুদণ্ডী উভয় ধরনের জলজ ও স্থলজ প্রাণীর মধ্যে অনেকেই গ্রীষ্মনিদ্রায় যায়। গ্রীষ্মে অতিরিক্ত গরমের হাত থেকে রক্ষা পেতে এরা মাটির নীচে বা গর্তে কাদামাটিতে ঘুমিয়ে পড়ে। এ সময় তাদের হৃদস্পন্দন কমে যায়। জলেরও প্রয়োজন হয় না। গরমে মরু অঞ্চলে জলের অভাব অত্যন্ত বেড়ে যায়। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিবর্তনের জেরেই গ্রীষ্মনিদ্রার কৌশল রপ্ত করেছে ওইসব প্রাণী। কিছু কিছু শামুক, লাংফিশকে গ্রীষ্মনিদ্রা দিতে দেখা যায়।
Advertisement
গ্রীষ্ম বা শীতনিদ্রা— দুইয়ের মূল কারণ শক্তিসঞ্চয়। তোমরা জানো যে, শীতকালে সাপ ও ব্যাঙের মতো প্রাণী কম দেখা যায়। ঘুমিয়ে গেলে শরীরে সক্রিয়তা কমে যায়। এভাবেই এরা শরীরের শক্তি বাঁচায়। আবার তাপমাত্রার পারদ একটু বেশি উঁচুতে থাকলে অর্থাৎ গরম থাকলে এরা বাইরে বেরিয়ে আসে। এখন প্রশ্ন হল, শীতে সাপ-ব্যাঙের মতো প্রাণীরা কাবু হয়ে পড়ে কেন? এরা আসলে শীতল রক্তের প্রাণী। জানতে চাইতেই পার, ওদের রক্ত ঠান্ডা কেন? আসলে সাপ-ব্যাঙ বা অন্যান্য সরীসৃপ প্রজাতির মধ্যে দেহের সুনির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখার ব্যবস্থা নেই। নেই কোনও তাপ উৎপাদন ব্যবস্থা। এদের শরীরের তাপমাত্রা পরিবেশের তাপমাত্রার সঙ্গে বদলে যায়। অর্থাৎ পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়লে এদের দেহের তাপমাত্রা বাড়ে। আবার পরিবেশের তাপমাত্রা কমলে এদের দেহের তাপমাত্রা কমে। এজন্য এদের ঠান্ডা রক্তের প্রাণী বলে। মানুষ, পাখি, বাঘ সহ অন্যান্য প্রাণী খাদ্য পরিপাক প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ ব্যবহার করে দেহের তাপমাত্রা স্থির রাখে। বাইরের তাপমাত্রা যেমনই হোক না কেন, মানবদেহের তাপমাত্রা সব সময় প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট থাকে। শীতে মানুষের গরম পোশাক হলেই যথেষ্ট। আর সাপ-ব্যাঙের মতো প্রাণী নিরাপদ একটা গর্ত বা কোটরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ে। আর এই সময়টা ওদের শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি, রক্ত সঞ্চালন একেবারে কমে যায়। দেখলে মনে হবে একেবারে নিঃস্পন্দ। মরে গিয়েছে। প্রকৃতির নিয়মে ঘুমে ঢলে পড়ার আগে এইসব প্রাণীরা প্রয়োজনমতো শক্তি বা চর্বি শরীরে জমাতে থাকে। দীর্ঘ ঘুমের সময় সেই শক্তি কাজে লাগিয়ে কোনওরকমে তারা প্রাণরক্ষা করে। নির্দিষ্ট জায়গায় বেশ কিছুদিন ঘুমিয়ে আবার পরিবেশের তাপমাত্রা বাড়লে শীতঘুম ভাঙে ওইসব প্রাণীর।



