Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

পুরুলিয়ার সিজানো পরবের নেপথ্যে এক লোককথা  

পুরুলিয়ার সিজানো পরবের নেপথ্যে এক লোককথা
 
  • ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
সংবাদদাতা, রঘুনাথপুর: সরস্বতী পুজার পরের দিন পুরুলিয়া জেলাজুড়ে সিজানো অর্থাৎ বাসি ভাতের উৎসব হয়ে থাকে। জেলার ৯০ শতাংশ মানুষ এই উৎসবে শামিল হন। মঙ্গলবার সিজানো উপলক্ষ্যে জেলার বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে। তবে সবচেয়ে বড় মেলা রঘুনাথপুরের জয়চণ্ডী পাহাড়ের পাদদেশে কালী পাহাড়ে হয়। রঘুনাথপুর শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়ের পাদদেশে মেলায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। পুরুলিয়া জেলা ছাড়াও বিহার, ঝাড়খণ্ডের মানুষ মেলায় শামিল হন। মেলায় সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হল, পাহাড়ের উপরে একটি কালীমন্দির রয়েছে। যাঁরা মেলা দেখতে আসেন তাঁদের পরিবারের একজন নারকেল ফাটিয়ে শিবের উদ্দেশ্যে কালীমন্দিরে পুজো দেন। নারকেলের জলের ধারা পাহাড়ের উপর থেকে নীচে নেমে আসে। তা দেখার জন্য প্রচুর ভিড় জমে।
Advertisement
রঘুনাথপুর পুরসভার চেয়ারম্যান তরণী বাউরি বলেন, প্রতিবছর মেলা দেখতে প্রচুর মানুষ আসেন। অন্যান্য রাজ্যও থেকেও মানুষরা ভিড় জমান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, উৎসব থাকলে উপলক্ষ্যে থাকবেই। আর একটি মিথ বা কাহিনিকে ঘিরেই উৎসবের সূচনা হয়। সরস্বতী পুজোর পরের দিন পুরুলিয়াবাসীর সিজানো বা বাসিভাত পরবের আড়ালে এমনই এক আকর্ষণীয় লোককথা রয়েছে। আর সেই লোক কাহিনির সূত্র ধরেই জেলায় বছরের পর বছর পরব পালিত হচ্ছে। লোককথায় শোনা যায়, কোনও এক সময়ে এক রাজার ছেলেরা সরস্বতী পুজোর আগের দিন জঙ্গলে শিকার করতে যায়। রাস্তায় ষষ্ঠী দেবীর সঙ্গে তাঁরা খারাপ আচরণ করেন। কোনও এক কারণে রাজপুত্রদের ওপর ষষ্ঠী দেবীর ভীষণ রাগ হয়। রাগে ষষ্ঠী দেবী রাজপুত্রদের প্রাণ হরণ করেন। অন্যদিকে, সারা দিন পার হলেও ছেলেরা বাড়ি না ফেরায়, রাজা-রানি জঙ্গলে তাদের খুঁজতে যান। সেদিন সরস্বতী পুজো ছিল। রাজা-রানিকে পরীক্ষা করতে ষষ্ঠী দেবী জরাগ্রস্ত বৃদ্ধার রূপ ধারণ করে একটি গাছের তলায় বসে থাকেন। সেই সময়ে রাজ দম্পতি তাঁর কাছে গিয়ে সন্তানদের খোঁজ করেন। বৃদ্ধা বলেন, তাঁর সারা পায়ে পুঁজ জমেছে। রানি তা জিভ দিয়ে চেটে পরিষ্কার করে দিলে রাজপুত্রদের সন্ধান জানা যাবে। সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আশায় রানি বৃদ্ধার দেহের পুঁজ চেটে পরিষ্কার করেছিলেন। আর তা দেখে খুশি হয়ে ষষ্ঠী দেবী নিজের রূপ ধারণ করে রাজপুত্রদের ফিরিয়ে দেন। সরস্বতী পুজোর পরদিন রাজা-রানি সন্তানদের নিয়ে রাজ্যে ফিরে এলে প্রজারা উৎসবে মাতেন। সেদিন কারও বাড়িতে রান্না হয়নি। সবাই বাসি খাবার খান। ষষ্ঠী দেবীও বলেন, সরস্বতী পুজোর পর দিন যাঁরা বাসি খাবার খাবেন, তাঁদের পরিবারে শোক থাকবে না। বাসি ভাতের পরব সেই থেকেই শুরু হয়। পুরুলিয়ার মানুষ সরস্বতী পুজোর দিন ঘরে ঘরে ষষ্ঠী পাতেন। ভাত, ডাল, মাছ, সব্জি রান্না করেন। অনেকেই দিনটিকে অরন্ধন দিবস বলেন। কারণ এদিন জেলার ৯০ শতাংশ বাড়িতে রান্না হয় না। সকলেই বাসি খাবার খান। আসলে এর পিছনে এক বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে বলে অনুমান। দেখা গিয়েছে, সরস্বতী পুজো বসন্তের প্রাক মুহূর্তে হয়। সেই সময়ে বসন্ত রোগ বা পক্স দেখা দেয়। তাই মশলাদার খাবার না খেয়ে বাসি খাবার বা সেদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। এই বিষয়টাই বোঝানোর জন্য বহু কাল আগে বিভিন্ন শাক, সব্জি, ডাল, মাছ সরস্বতী পুজো বা বসন্ত পঞ্চমীর দিন রান্না করে পরের দিন বাসি করে খাবার প্রথা চালু হয়। 
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ