Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

হাঁটতে পারে না, বাবার কাঁধে চেপে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রিয়াঙ্কা

হাঁটতে পারে না, বাবার কাঁধে চেপে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রিয়াঙ্কা
  • ১৩ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজদীপ গোস্বামী, পিংলা: বাবা ধনী না গরিব, তাতে কিছ যায় আসে না।  বাবার কাঁধটা কতটা চওড়া সেটাই বড় কথা। যে কাঁধের উপর ভর করে জীবনের সাফল্যের ভিত গড়তে পারে সন্তানরা। যেমন গড়ছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার প্রিয়াঙ্কা ভৌমিক এবং সবংয়ের কল্যাণ বেরা।  

Advertisement

প্রিয়াঙ্কা আর পাঁচজন ছাত্রীর মতো স্বাভাবিক নন। হাঁটা-চলা করতে পারেন না। কিন্তু, তাঁকে যে পড়াশোনা করে বড় হতে হবে। স্বপ্ন দেখেন তিনি। স্বপ্ন দেখান তাঁর বাবা বরুণ ভৌমিক। প্রিয়াঙ্কা এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। বাড়ি থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রে আসা সম্ভব নয়। আবার প্রাইভেট গাড়িতে মেয়ে নিয়ে আসার মতো ট্যাঁকের জোরও নেই বরুণবাবুর। অতঃপর, প্রিয়াঙ্কার কাছে ভরসা একমাত্র বাবার  চওড়া কাঁধ। মাধ্যমিক দিয়েছেন বাবার সেই কাঁধে চেপে। উচ্চ মাধ্যমিকও দিচ্ছেন সেই কাঁধের ভরসায়। পরীক্ষার দিনগুলিতে বাবার কাঁধে চেপে পরীক্ষাকেন্দ্রে আসেন। ঠায় অপেক্ষা করেন বরুণবাবু। পরীক্ষা শেষ হলে প্রিয়াঙ্কা ফের বাবার কাঁধে চড়ে বসেন। বাড়ি ফেরেন বাপ-বেটিতে। 
ইচ্ছেশক্তির একটি মুখ যদি হয় প্রিয়াঙ্কা, অন্যটি অবশ্যই কল্যাণ বেরা। সবংয়ের পেরুয়া এলাকায় বাড়ি কল্যাণের। জন্ম থেকেই দু’টি হাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ছোট। তাই হাত দিয়ে লিখতে পারেন না। পা’য়ের সাহায্যে লেখেন। তাতেই মাধ্যমিকে দুর্দান্ত ফল। উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছেন বলপাই হাই স্কুলে। সিট পড়েছে করকাই বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠ স্কুলে। পরীক্ষা দিচ্ছেন পা’য়ে লিখে। কল্যাণের খাতা দেখে তাজ্জব পরীক্ষকরা। পা’য়ে এত সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন লেখা যায়, তা ভেবেই পাচ্ছেন না তাঁরা। শিক্ষকদের কেউ কেউ বলছিলেন, ‘অদম্য ইচ্ছেশক্তি না থাকলে খুব দ্রুত ও সুন্দর লেখা সম্ভব নয়।’ কল্যাণের সেই ইচ্ছেশক্তির প্রেরণাও বাবা সুশান্ত বেরা। সামান্য কৃষক তিনি। একদিন মাঠে কাজ না করলে বাড়িতে হাঁড়ি চড়ে না। তা সত্ত্বেও ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে আসেন। পরীক্ষা শেষ হলে বাড়ি ফেরেন বাপ-বেটায়। কল্যাণকে সারাক্ষণ আগলে রাখেন মা সূচিত্রাদেবীও।  
প্রিয়াঙ্কাই হোক কিংবা কল্যাণ—দু’জনেই পিংলা ও সবংয়ের গর্ব। শারীরিক প্রতিকূলতাকে হারিয়ে তাঁদের জীবনের পথ সুগম করার অদম্য চেষ্টাকে কুর্নিশ করছেন দুই এলাকার বাসিন্দারা। সেই সঙ্গে দু’জনের বাবা-মা’কেও ধন্যবাদ জানাচ্ছেন সকলেই। দু’জনের স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও তাঁদেরকে ইচ্ছেশক্তির অন্যন্য নজির হিসেবে খাঁড়া করেন অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের সামনে। 
পিংলার পালগেড়িয়া গ্রামে প্রিয়াঙ্কার জন্ম ২০০৫ সালে। বাবা সামান্য চাষের কাজ করেন। মা অপর্ণা ভৌমিক গৃহিণী। তাঁদের একমাত্র সন্তান প্রিয়াঙ্কা। আদর-যত্নে বড় হয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি বরাগেড়িয়া রমানাথ আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। আর্টস বিষয়ে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক দিচ্ছেন। পরীক্ষাকেন্দ্র করকাই হাই স্কুল।
জানা গিয়েছে, প্রিয়াঙ্কা তখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। একদিন সকালে মায়ের বকুনি খেয়ে ভয়ে বাড়িতে পড়ে যায় সে। থাইয়ের উপরেরের অংশ ভেঙে বা খুলে যায়। এক মাস ধরে ট্রাকশন পদ্ধতিতে চিকিৎসা চলে। তাতে সম্পূর্ণ সুস্থও হয়ে ওঠে। তবে, মামার বাড়িতে গিয়ে খেলা ধুলোর সময় পড়ে গিয়ে ভাঙা অংশের হাড় ফের সরে যায়। এরপর ভুল চিকিৎসায় প্রিয়াঙ্কা আর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি বলে তাঁর বাড়ির লোকের অভিযোগ। বরুণবাবু বলছিলেন, ‘ভালো জায়গায় চিকিৎসা করালে হয়তো মেয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারত। কিন্তু আমার অত টাকা নেই। তবে, আমার চওড়া কাঁধ রয়েছে।’ প্রিয়াঙ্কার কথায়, ‘প্রশাসন থেকে মেঝেতে বসে পরীক্ষার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। স্কুলের শিক্ষক সহ সকলের থেকে সাহায্য পাচ্ছি। ভালো করে পরীক্ষা দিতে চাই।’ কল্যাণ বলছিলেন, ‘চেষ্টা করছি ভালো রেজাল্ট করার। রেজাল্টই দেখিয়ে দেবে ভবিষ্যতের দিশা।’ 
প্রতিবন্ধকতা ভুলে প্রিয়াঙ্কা-কল্যাণের চার চোখে শুধুই স্বপ্ন। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ