কাঠমাণ্ডু: ‘পুরো গ্রাম নদী গিলে নিয়েছে, এখনই পালিয়ে যাও।’ বুধবার সকালে বন্ধুর থেকে এমনই সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন ত্রিভুবন ত্রিশুলি সেকেন্ডারি স্কুলের প্রিন্সিপাল রাজেন্দ্র দাওয়াদি। সেই সতর্কবার্তা পেয়ে বেশি দেরি করেননি তিনি। স্কুল ছেড়ে পড়ুয়াদের নিয়ে আশ্রয় নিলেন একটা উঁচু অংশে। প্রিন্সিপালের উপস্থিত বুদ্ধি ও তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্তের জেরেই প্রাণ বাঁচল প্রায় ১৭০০ পড়ুয়ার। নেপালের মৃত্যুমিছিলের মধ্যেই ৪৭ বছরের রাজেন্দ্রর এই সাহসিকতা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। অনেকেই তাঁকে বলছেন, ত্রিশুলির হিরো। যদিও রাজেন্দ্র নিজে এসব নিয়ে ভাবিত নন। কাদার নীচে কার্যত ডুবে যাওয়া স্কুলের ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর একটাই মন্তব্য, ‘এছাড়া আমি আর কীই বা করতাম?’
ঘড়িতে তখন সকাল ৯টা ২০ মিনিট। ত্রিশুলি উপত্যকার তিনতলা ওই স্কুলটিতে তখন ১ হাজার ৬৪৩ জন পড়ুয়া উপস্থিত! একের পর এক জনপদ ধ্বংস করে তখন স্কুলের এগিয়ে আসছে বিধ্বংসী হড়পা বান। ঠিক তখনই সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন রাজেন্দ্র। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন তিনি। কারণ, কংক্রিটের তৈরি ওই স্কুল নদী থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ওতটা উঁচুতে জলস্তর উঠবে না বলেই বিশ্বাস ছিল রাজেন্দ্রর। কিন্তু সেই সময়ই এক পড়ুয়ার অভিভাবক ছুটে এসে তাঁকে জানান, নদীর জলস্তর হুহু করে বাড়ছে। তারপরই আর দ্বিতীয়বার ভাবেননি রাজেন্দ্র। সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টা বাজিয়ে অন্য শিক্ষকদের নির্দেশ দেন, স্কুলভবন খালি করতে হবে। স্কুলের বাসচালকদেরও তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলেন। তবে, একজন বাসচালককে তিনি সতর্ক করতে পারেননি। কারণ, ওই বাসটি আর সেতু পেরিয়ে স্কুলের দিকে আসতে পারেনি। ওই বাসচালক সম্ভবত ভেসে গিয়েছেন।
প্রিন্সিপালের সতর্কবার্তা পাওয়ার পর পড়ুয়ারাও বুঝতে পারে যে বিপদ আসতে চলেছে। তার জেরে এক ছাত্রী প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হয়। তাকে বাইকে চাপিয়ে পাহাড়ের উঁচু অংশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। বাকিরা রাজেন্দ্রর সঙ্গে দৌড়ে উঁচু নিরাপদ স্থানে একটি বোধি গাছের তলায় আশ্রয় নেয়। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই হড়পা বানের জল-কাদার নীচে চলে যায় পুরো স্কুল ভবন। সব পড়ুয়াকে বেঁচে গেলেও ওই স্কুলের এক শিক্ষক ও সাফাইকর্মীর প্রাণ রক্ষা হয়নি। সন্তোষ পারিয়ার নামে ৩২ বছরের এক শিক্ষক স্কুলের পাশেই ভাড়া বাড়িতে রান্না করছিলেন। তিনি সময়মতো বের হতে পারেননি। সুলতান লামা নামে ওই সাফাইকর্মী সকলকে বের করে দেওয়ার পর স্কুলের দরজা বন্ধ করতে গিয়েছিলেন। তিনিও ভেসে গিয়েছেন। রাজেন্দ্র দাওয়াদি।