সংবাদদাতা, ঝালদা: শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনও মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না, এই সত্যই প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছেন পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি ব্লকের ডাভা তোড়াং নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের শিক্ষক জগন্নাথ মাহাতো। জন্ম থেকেই দু’ হাত নেই। কিন্তু সেই প্রতিবন্ধকতাকে কখনও নিজের জীবনের বাধা হতে দেননি তিনি। পা দিয়েই ব্ল্যাক বোর্ডে লেখেন, খাতার মূল্যায়ন করেন, পাঠদান করেন এবং প্রতিদিন ছাত্রছাত্রীদের শেখান সাফল্যের আসল চাবিকাঠি হল অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়।
বাঘমুন্ডি ব্লকের বুড়দা গ্রামের বাসিন্দা ৪১ বছরের জগন্নাথ মাহাতো। কৃষক পরিবারে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই বিশেষভাবে সক্ষম হলেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। বুড়দা বিবেকানন্দ শিশু নিকেতনে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ২০০০ সালে বুড়দা হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক, ২০০২ সালে ঝালদা সত্যভামা বিদ্যাপীঠ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ২০০৬ সালে পুরুলিয়ার জে কে কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ২০১২ সালে টেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের আগে তিনি কলকাতার সল্টলেকের বেনফিশ দপ্তরেও কাজ করতেন। ২০১৪ সালে ডাভা তোড়াং নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তারপর থেকে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষাদান করে চলেছেন। পরিবারে জগন্নাথের মা, স্ত্রী এবং একটি সন্তান রয়েছে। জগন্নাথ মাহাতোর কথায়, ছোটবেলায় দিদিদের পড়তে দেখে তাঁরও পড়াশোনার আগ্রহ তৈরি হয়। একদিন পায়ের আঙুলে কলম ধরে লেখার চেষ্টা করেন। সেই দৃশ্য দেখে পরিবারের সদস্যরাও তাঁকে উৎসাহ দেন। এরপর থেকেই পায়ের সাহায্যে লেখা, আঁকা ও দৈনন্দিন সমস্ত কাজ করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। আজ তিনি নিজের সমস্ত কাজ নিজেই করেন। তাঁর মতে, মানুষের মনের জোরই তাকে সাফল্যের পভ দেখায়। ছেলেকেও শিক্ষক করার ইচ্ছে রয়েছে জগন্নাথের। যাতে সেও শিক্ষাদান করতে পারে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইন্দ্রজিৎ কুমার বলেন, ‘জগন্নাথবাবুর নিষ্ঠা ও কর্মস্পৃহা সত্যিই অনুকরণীয়। তাঁকে দেখে কখনও মনে হয় না তিনি বিশেষভাবে সক্ষম। ছাত্রছাত্রীদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা এবং দায়িত্ববোধ সকলের কাছে অনুপ্রেরণা।’ এক ছাত্রের অভিভাবক দেবেন মাহাতোর কথায়, ‘জগন্নাথবাবু যেভাবে শিশুদের পড়ান, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। ওঁর মতো শিক্ষক পেয়ে আমরা গর্বিত।’ পড়ুয়ারাও জানিয়েছে, তাঁর ক্লাসে পড়তে তাদের খুব ভালো লাগে। শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন স্নেহশীল, তেমনই শৃঙ্খলাবদ্ধ। পা দিয়েই ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন শিক্ষক জগন্নাথ মাহাতো। -নিজস্ব চিত্র